প্রকাশিত: জুন ২৮, ২০২৬

মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন,
(ন্যাশনাল এ্যাডভোকেসি কো-অর্ডিনেটর, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ):
একটি শিশুর চোখে যখন বড় হওয়ার স্বপ্ন থাকে, তখন সেই স্বপ্ন কেবল তার একার থাকে না; বরং তা একটি জাতির ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আমাদের সমাজে দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাতে কত শত সাইফুল অকালেই ঝরে যায়, তার ইয়াত্তা নেই।
পশারীবুনিয়ার কিশোর সাইফুলের গল্পটিও প্রায় একই পরিণতির দিকে যাচ্ছিল। কিন্তু সঠিক সময়ে মানবিক সংহতি কীভাবে একটি নিভে যাওয়া প্রদীপকে পুনরায় প্রজ্বলিত করতে পারে, তার এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে সে।
সাইফুলের বাবা অটো-রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন। টানাটানির সংসার হলেও সাইফুলের চোখে ছিল আকাশছোঁয়া স্বপ্ন সে ডাক্তার হবে! সাদা অ্যাপ্রন গায়ে জড়িয়ে সেবাপ্রার্থী অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবে। এই লক্ষ্যেই সে নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিল। কিন্তু বিধাতা হয়তো অন্য কিছু ভেবে রেখেছিলেন। বাবার অসুস্থতা হঠাৎ করেই পরিবারটিকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেয়। একদিকে অসুস্থ বাবার চিকিৎসা, অন্যদিকে সংসারের ঘানি সব মিলিয়ে মা যখন নিরুপায় হয়ে বললেন, “লেখাপড়া আর সম্ভব নয়, তখন সাইফুলের স্বপ্নের জগৎটা যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল!
বই-খাতা ফেলে রেখে সাইফুলকে হাতে তুলে নিতে হলো দিনমজুরের সরঞ্জাম। দিনে ৩/৪শ’ টাকার বিনিময়ে কায়িক শ্রমে তার শৈশব বন্দি হলো। শিক্ষার আঙিনা থেকে ছিটকে পড়া এই কিশোরের বেদনা হয়তো অজানাই থেকে যেত, যদি না সেখানে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ এর মতো সহমর্মী প্রতিষ্ঠানের পদচিহ্ন পড়ত।
সাইফুলের জীবন পরিবর্তনের এই পর্যায়টি আমাদের সমাজ সংস্কারকদের জন্য একটি বড় পাঠ। কেবল মুখে আশ্বাস নয়, বরং তারা সাইফুলের পরিবারের মূল সমস্যাটি চিহ্নিত করেছিল। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং সমাজসেবা অফিসের সাথে সমন্বয় করে পরিবারটির জন্য একটি স্থায়ী আয়ের পথ তৈরি করা হয়েছে। বাড়ির উঠানে সবজি বাগান এবং মাত্র ৫ হাজার টাকার ক্ষুদ্র আর্থিক অনুদান আজ তাদের নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখাচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, বিদ্যালয়ের সাথে যোগাযোগ করে সাইফুলের বেতন ও পরীক্ষার ফি মওকুফের ব্যবস্থা করা। এর ফলে সাইফুল আবার ক্লাসরুমে ফিরেছে, যেখানে গত নভেম্বর মাসে তার উপস্থিতি ছিল শতভাগ।
সাইফুলের এই প্রত্যাবর্তন কেবল ব্যক্তিগত বিজয় নয়; এটি শিশু শ্রম রোধ এবং ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের পুনরায় মূলধারায় ফিরিয়ে আনার একটি কার্যকর মডেল। ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের ফাইব জিরো” ক্যাম্পেইন বা পাঁচটি শূন্যের যে অঙ্গীকার তার মধ্যে ”জিরো শিশু শ্রম” জিরো বাল্য বিবাহ” জিরো স্কুল ঝড়ে পড়া” জিরো অপুষ্টি ও জিরো ক্ষুধার্ত শিশু উদ্যোগের এক সফল প্রতিফলন আমরা সাইফুলের গল্পে দেখতে পাই।
আজ সাইফুল আবার বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, সে ডাক্তার হতে পারবে। তার এই আত্মবিশ্বাস আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, সুযোগ এবং সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে কোনো অভাবই স্বপ্নের চেয়ে বড় হতে পারে না। আমাদের চারপাশে এমন আরও অনেক সাইফুল আছে, যারা কেবল একটুখানি সহায়তার অভাবে দিনমজুর হিসেবে জীবন অতিবাহিত করছে।
দারিদ্র্য বিমোচন কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয় বরং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন এবং সচেতন নাগরিকদের সমন্বিত প্রচেষ্টাই পারে শিশুদের শৈশব রক্ষা করতে। সাইফুলের মতো শিশুরা যেন অভাবের তাড়নায় নয়, বরং আগামীর আশা নিয়ে বড় হতে পারে সেটি নিশ্চিত করাই হোক আমাদের আজকের অঙ্গীকার। শত সাইফুলের ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ হোক, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম যেন তাদের স্বপ্ন কেড়ে নিতে না পারে, দেশের প্রতিটি শিশুশ্রমিক ফিরে পাক তাদের প্রাপ্য শিক্ষার অধিকার আর সেই আন্দোলন শুরু হোক আমার নিজের থেকে, আমিই পারি ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম মুক্ত বাংলাদেশ গড়তে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে ।