৭ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার,রাত ৩:১৬

খুলনা-৬ আসনে প্রার্থীদের ভাগ্য নির্ধারণ হবে আওয়ামীপন্থীদের ভোটে

প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৬, ২০২৬

  • শেয়ার করুন

মোঃ আক্তারুজ্জামান লিটন : আসন্ন জাতীয় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে খুলনা-৬ (পাইকগাছা-কয়রা) নির্বাচনী এলাকায় শেষ সময়ের প্রচার-প্রচারনা জমে উঠেছে। বিএনপি, জামায়াতের পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলনের মনোনীত প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকদের প্রচার-প্রচারনায় ব্যাস্ত সময় পার হচ্ছে।

যদিও আসনটিতে সর্বশেষ বিএনপি ও জামায়াতের মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে দ্বিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রার্থী না থাকলেও নির্বাচনী লড়াইয়ে মূল লাগাম টানতে আওয়ামী লীগের ভোটার, বিশেষ করে সনাতনী ভোটাররা ভূমিকা রাখবে। ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ইসলামী আন্দোলনও রয়েছে সেই তালিকায়।

প্রথম দিকে জামায়াতের চাপে বিএনপি খনিকটা কোনঠাসা হয়ে পড়ে। একক প্রার্থী নিয়ে জামায়াতে ইসলামী তখন ফুরফুরে মেজাজে থাকলেও বিএনপি প্রায় অর্ধ ডজন সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের নিয়ে বাড়তি চাপে ছিল। এরপর দলীয় মনোনয়ন চুড়ান্ত ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর ক্রমশ পাল্টাতে থাকে দৃশ্যপট। বর্তমানে প্রচার-প্রচারনায় বিএনপি-জামায়াতের অবস্থান সমান সমান থাকলেও যে কারোর ভাগ্য নির্দ্ধারণে সহায়ক হতে পারে আওয়ামী লীগের ভোটাররা। এতে খানিকটা হলেও প্রভাব ফেলতে পারে ইসলামী আন্দোলনের সমর্থকরাও। শেষ সময়ে জামায়াতের মোর্চা থেকে বেরিয়ে একক নির্বাচন করছে তারা।

বরাবর আওয়ামী লীগ বিরোধী নির্বাচনে আসনটিতে কখনো আওয়ামী লীগ আবার কখনও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা বিজয়ী হন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দি প্রার্থীদের তালিকায়ও অবস্থানটা একই। তবে এবার ব্যাতিক্রমী আওয়ামী বিহীন নির্বাচনে তাদের ভোটাররা ভাগ্য গড়তে সহায়ক হবেন বিএনপি- জামায়াত প্রার্থীদের যে কারোর। বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটারদের ট্রাম্পকার্ড হিসেবে দেখা যাচ্ছে। এরপরও রয়েছে সদ্য জামায়াতের মোর্চা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া ইসলামী আন্দোলনের ভোটাররা। একসাথে নির্বাচন করলে তাদের ভোট জামায়াতের পাল্লাকে ভারী করতে সহায়ক ছিল। তবে এবারের চিত্রটাও ভিন্ন।

গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও পরে দলটি নিষিদ্ধ হওয়ার পর মূলত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির প্রার্থীরা আসনটি পুনরুদ্ধারে রীতিমত কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন।

জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে আসনটি বরাবরই তাদের অনুকুলে ছিল দাবি করে বলা হচ্ছে, এলাকার সর্বস্তরের মানুষ তাদের মনোনীত প্রার্থী আবুল কালাম আজাদকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করছে।

অন্যদিকে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি দীর্ঘ দিন জোটবদ্ধ নির্বাচনে অংশগ্রহন করায় শরীক দল আসনটি জামায়াতকে ছাড় দেওয়ায় প্রার্থী দিতে পারেনি। ১৯৯৬ সালে প্রার্থী দিলেও মূলত আওয়ামীলীগের প্রার্থীকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি মনে করায় সাধারণ ভোটাররা জামায়াতের দিকেই ঝুঁকে পড়ে। বিশেষ করে আওয়ামী এন্ট্রি ভোটাররা জামায়াতের প্রার্থী অধ্যক্ষ শাহ মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুসকেই ম্যান্ডেট দেয়। ঐ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী জি,এ সবুর ১৬,৮৩৫ ভোট পান। আওয়ামী লীগের প্রার্থী এ্যাড. শেখ মো: নূরুল হক ৬৬,০৩৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হলেও জামায়াতের প্রার্থী শাহ্ মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস ৪৯,০২৩ ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দি ছিলেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মঈন উদ্দিন সরকার ৬,৬০২ ভোট পেয়ে চতুর্থ অবস্থানে ছিলেন। ঐ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী রুহুল কুদ্দুস ৫৮,৩৬৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী ও নিকটতম প্রতিদ্বন্দী আওয়ামী লীগের প্রার্থী শেখ নূরুল হক ৫৭,৬৬৯ ভোট পান। এরপর আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিহীন নির্বাচনে বিএনপির সাথে জামায়াতের জোট না থাকায় বিএনপিকে এগিয়ে রাখছেন কেউ কেউ।

বিএনপির দাবি, সময়ের পরিক্রমায় আসনটিতে বিএনপির অবস্থান অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে শক্ত ও সংগঠিত। তাছাড়া আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বাইরে থাকলেও তাদের ঘরানায় থাকা সনাতনীদের প্রায় ১ লক্ষ ভোট আসন্ন নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্দ্ধারণ করতে পারে।

তৃণমূলের এসব ভোটাররা বুথমূখী হলে তাদের সমর্থন যে কারো বিজয়ের পথে টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে। সবকিছু মিলিয়ে বিএনপিই এগিয়ে রয়েছে বলে মনে করছেন তারা। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন শেষ মূহুর্তে জামায়াতের জোট থেকে বেরিয়ে আসায় তাদের ভোটাররাও একটা ফ্যাক্ট বলে মনে করা হচ্ছে।

নির্বাচন অফিসের তথ্যানুযায়ী, এ আসনটিতে ১৯৭৩ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ৮টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যথাক্রমে ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের স.ম বাবর আলী, ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারী নির্বাচনে বিএনপির এ্যাড. শেখ রাজ্জাক আলী নির্বাচিত হন। এরপর সীমানা পরিবর্তনের পর ১৯৮৬ সালের ৭ মে নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মোমিন উদ্দিন, ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জহুরুল হক, ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যক্ষ শাহ মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী নির্বাচনে আসনটি শূণ্য থাকে। ১৯৯৬ সালের ১২ জুন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শেখ মো: নূরুল হক, ২০০১ সালের ১ অক্টোবর জামায়াতের শাহ মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস এবং ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগের প্রার্থী এ্যাড. সোহরাব আলী সানা নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারী, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর ও ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারী বিতর্কিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা যথাক্রমে প্রয়াত এ্যাড. শেখ মো: নূরল হক, আক্তারুজ্জামান বাবু ও সর্বশেষ মো: রশীদুজ্জামান নির্বাচিত হন।

জামায়াত নেতা মাওলানা আবুল কালাম আজাদ বলেন, অবাধ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর বিজয় নিশ্চিত।

খুলনা- ৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনটি পাইকগাছা উপজেলার ১০ টি, কয়রা উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও ১টি পাইকগাছা পৌরসভা নিয়ে গঠিত। প্রায় ৪ লাখ ভোটার অধ্যুষিত এ আসনে আওয়ামী লীগ বিহীন আসন্ন নির্বাচনে তারাই এগিয়ে রয়েছেন।

স্বাধীনতা পরবর্তী মোট ১২ টি নির্বাচনের সর্বশেষ ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চারটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হাতে থাকা এ আসনটি পূণরুদ্ধারে প্রাণপণ চেষ্টা করছে জামায়াত ইসলামী। অন্যদিকে তীব্র প্রতিদ্বন্দিতার মুখে নিজেদের অবস্থান ও সমর্থনের বিষয়টি জানান দিতে বিএনপিও মরিয়া।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় নির্বাচন থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১২ টি নির্বাচনে আওয়ামীলীগ ৬ বার, জামায়াত ইসলামী ২ বার, জাতীয়পার্টি ১ বার, বিএনপি ১ বার, স্বতন্ত্র ১ বার নির্বাচিত হয়। তবে ২০২৪ এর ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সুন্দরবন উপকূলীয় জনপদের গুরুত্বপূর্ণ আসনটিতে নতুন উদ্যমে বেড়ে ওঠা বিএনপি দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতের উপর ঠিক কি ধরনের প্রভাব ফেলবে তার বহুলাংশে নির্ভর করছে আওয়ামী ভোটার বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ ইসলামী আন্দোলনের অধিপত্য ও অবস্থানের উপর। তবে তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে আগামী নির্বাচন পর্যন্ত।

ভাল লাগলে শেয়ার করুন
  • শেয়ার করুন