২২শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, বুধবার,রাত ২:০৭

ভোমরা স্থলবন্দরে চলতি বছরে রাজস্ব আদায় ৭৫৫ কোটি টাকা, ঘাটতি ৩৬৬ কোটি টাকা।

প্রকাশিত: জুন ১৮, ২০২১

  • শেয়ার করুন

এম জিয়াউল ইসলাম জিয়া, ভোমরা, সাতক্ষীরা ঃ
বাণিজ্যবান্ধব ও রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়েছে ভোমরা স্থলবন্দর। আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র বিমোচনে এ বন্দরটি একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেও চলমান প্রাণঘাতি করোনার করালগ্রাসে বিপর্যস্ত বাণিজ্যখাত। রাজস্ব প্রবৃদ্ধির রোল মডেল হিসেবে উচ্চারিত এ বন্দরটি নানামুখী সমস্যায় জর্জরিত। বন্দর ব্যবহারকারী কর্তৃপক্ষের অদূরদর্শীতা, কাষ্টম্স প্রশাসনের অপ্রতুল বঞ্চিত সুযোগ সুবিধা, দ্রুত পণ্য সরবরাহে সড়ক অচলাবস্থা, বহিঃশত্রুদের শ্যেনদৃষ্টি, আমদানী-রপ্তানী বাণিজ্যে বেমাতাসুলভ আচরণ, দূর্ণীতির মৌন কৌশলী ঘুষবাণিজ্য, রাজনৈতিক একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার এবং স্বজনপ্রীতির যাঁতাকলে নিষ্পেষিত স্থলবন্দর ভোমরার প্রাণকেন্দ্র। অন্তহীন সমস্যার বেড়াজালে আটকে পড়া ভোমরা স্থলবন্দরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড(এনবিআর) চলতি ২০২০-২০২১ অর্থবছরে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ১ হাজার ১২১ কোটি টাকা নির্ধারণ করে দেয়। সরকার চলতি অর্থবছরের শেষার্ধে অর্থ্যাৎ ১৬ই জুন ২০২১ পর্যন্ত নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ৭৪৩ কোটি ৭৬ লক্ষ ৩৬ হাজার ১৪৬ টাকা রাজস্ব অর্জন করতে সক্ষম হয়। কিন্তু এখনো ঘাটতি রয়েছে ৩ শ ৭৮ কোটি ৩৬ হাজার ১৪৬ টাকা। করোনার প্রাদুর্ভাবকালে ২৫ শে মার্চ থেকে ১৯ শে জুন ২০২০ পর্যন্ত এ বন্দরে সকল প্রকার আমদানী-রপ্তানী কার্যক্রম বন্ধ থাকায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক ঘোষিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বাঁধাগ্রস্থ হয়। দক্ষিণবঙ্গ সাতক্ষীরার ভৌগলিক অবস্থানের দিক থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোলকাতার দূরত্ব মাত্র ৬০ কিলোমিটার। যে কারণে স্থানীয় ও বাইরের আমদানী-রপ্তানীকারক ব্যবসায়ীরা ভোমরা বন্দর দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে যথেষ্ট আগ্রহী। কিন্তু এ বন্দর দিয়ে অধিক রাজস্ব আহরণকৃত কোনো পণ্য প্রবেশে অনুমতি না থাকায় প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা দেশের অন্য স্থলবন্দর দিয়ে ব্যবসা করতে ইচ্ছুক। বন্দর ব্যবহারকারীদের মতে, অন্যান্য বন্দরের ন্যায় ভোমরা বন্দর দিয়ে সকল প্রকার পণ্য আমদানী-রপ্তানীর সুযোগ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলে সরকার এ বন্দর থেকে বছরে লক্ষ্যমাত্রার অধিক রাজস্ব অর্জন করতে সক্ষম হবে। এদিকে করোনার থাবায় ভোমরা স্থলবন্দরে অর্জিত হয়নি চলতি বছরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা, এমনটাই দাবী সংশ্লিষ্ট মহলের। তবে চলতি অর্থবছর শেষ হতে এখনো ১০ থেকে ১২ দিন বাকী। গড়ে প্রতিদিন ১ কোটি টাকা আদায় হিসেবে ১২ দিনে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ১২ কোটি টাকা। সুতরাং চলতি অর্থবছরের সর্বমোট রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৫৫ কোটি ৭৬ লক্ষ ৩৬ হাজার ১৪৬ টাকা। এরপরেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ঘাটতি থাকে ৩৬৬ কোটি ৭৬ লক্ষ ৩৬ হাজার ১৪৬ টাকা। ফলে সরকার হারিয়েছে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। দীর্ঘদিন বন্দরে কার্যক্রম বন্ধ থাকার পর আমদানী ও রপ্তানী কার্যক্রম চালু হলেও উন্নয়ন হয়নি রাজস্ব খাতে। এদিকে করোনা প্রাদুর্ভাবের শুরুতে গত বছরের ২৫ শে মার্চ থেকে সরকারী নির্দেশনায় বন্ধ হয়ে যায় বন্দরের আমদানী-রপ্তানী কার্যক্রম। ৩ মাস বন্ধ থাকার পর ১৯ শে জুন ২০২০ পুনরায় আমদানী-রপ্তানীর জন্য খুলে দেওয়া হয় বন্দরের কার্যক্রম। ২৩ শে জুন থেকে ৩০ শে জুন পর্যন্ত আমদানী কার্যক্রমের উপর রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৪ কোটি ১১ লক্ষ টাকা, জুলাই মাসে ৫৪ কোটি ৭৬ লক্ষ টাকা, আগষ্ট মাসে ৪৬ কোটি ৪১ লক্ষ টাকা, সেপ্টেম্বর মাসে ৫৩ কোটি ৯৩ লক্ষ টাকা, অক্টোবর মাসে ৭২ কোটি ১৯ লক্ষ টাকা, নভেম্বর মাসে ৭৩ কোটি ৪৬ লক্ষ টাকা, ডিসেম্বর মাস ৯৩ কোটি ২৭ লক্ষ, জানুয়ারি মাসে ৭৮ কোটি ১৬ লক্ষ, ফেব্রুয়ারি মাসে ৮৮ কোটি ১২ লক্ষ , মার্চ মাসে ৮০ কোটি ৫৩ লক্ষ টাকা, এপ্রিল মাসে ৬০ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা ও মে মাসে ২৬ কোটি ৬০ লক্ষ টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। এদিকে ভোমরা কাষ্টম্স সিন্ডএফ এজেন্টস এ্যাসোসিয়েশনের অর্থ সম্পাদক মাকসুদুর রহমান জানান, -ব্যবসায়ীরা ভোমরা বন্দর ব্যবহার কমিয়ে দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা যে বন্দরে সুবিধা পাবে সেখানে পণ্য আমদানী করবে। ভোমরা বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানীতে কোনো ছাড় দেওয়া হয় না। সে কারণে ভোমরা বন্দর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে অনেক প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা। রাজস্ব খাতেও দেখা দিয়েছে ব্যাপক ঘাটতি। তিনি আরো বলেন, বেনাপোল বন্দর দিয়ে কাঁচামাল পণ্য আমদানী করলে ব্যবসায়ীদের বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয় কিন্তু ভোমরা বন্দরে সেটা পাওয়া যায় না। এখানে নেই কোনো বিশেষ ছাড়। এক ট্রাক টমেটো আমদানী করলে বেনাপোল বন্দরে ছাড় দেওয়া হয় ৫ টন, আনারে ১৬ টনে ২ থেকে ৩ টন ছাড় পাওয়া যায় । এভাবে প্রতিটি পণ্যে ছাড় দেওয়া হয় ওই বন্দর থেকে। সেখানে ভোমরা বন্দরে এক কেজিও ছাড় দেওয়া হয় না। এছাড়া আমদানী বাণিজ্যে সময়ক্ষেপন সহ নানা অব্যবস্থাপনাও রয়েছে। ভোমরা কাষ্টম্স সিএন্ডএফ এজেন্টস এ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এস.এম আরাফাত হোসেন বলেন, ১৯৯৬ সালে ভোমরা বন্দর যখন প্রতিষ্ঠা লাভ করে তখন রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ১ কোটি টাকা। এখন হাজার কোটি টাকার বেশি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ হয়। মূলত বন্দর দিয়ে ৭৫ টি পণ্যের আমদানী সুযোগ থাকলেও বাস্তবে ২৫-৩০ টি পণ্য আমদানী হয়। এ ব্যাপারে ভোমরা শুল্ক স্টেশনের সহকারী কমিশনার আমির মাহমুদ জানান, করোনা মহামারী সহ নানা কারণে বন্দরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ঘাটতি রয়েছে ৬০২ কোটি ৯৮ লক্ষ টাকা। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ব্যবসায়ীরা ভোমরা বন্দর দিয়ে আমদানী অনেকটা কমিয়ে দিয়েছে। এছাড়া করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে টাকা ৩ মাস বন্ধ ছিলো ভোমরা বন্দর। ওই ৩ মাসে প্রায় ২৬০ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি রয়েছে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের আঘাতে আবারো আমদানী-রপ্তানী বাণিজ্য অনেকাংশ কমে গেছে। তবে গত অর্থবছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে প্রায় ২৬ শতাংশ রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। যদি সব বন্দরে ব্যবসায়ীদের জন্য একই নীতিমালা থাকতো তাহলে ভোমরা বন্দরে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি কয়েকগুণ বাড়তো।

তারিখ: ১৮/০৬/২০২১

ভাল লাগলে শেয়ার করুন
  • শেয়ার করুন