November 14, 2018, 11:22 am

ঋণ খেলাপি টিপু সুলতান ব্যাংকের খাতায় অদৃশ্য থাকলেও প্রতিদ্বন্দিতা করছেন বিজেএ এর নির্বাচনে

এইচ আর তানজিরঃ
রাত পোহালেই পহেলা সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জুট এসোশিয়েশন (বিজেএ)এর দ্বি বার্ষিক নির্বাচন। এ নির্বাচনে অডিনারি গ্রুপ থেকে পরিচালক পদে প্রতিদ্বন্দিতা করছেন ঢাকা ট্রেডিং হাউজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও দেশের আলোচিত ব্যবসায়ি মোঃ টিপু সুলতান। নির্বাচনের প্রয়োজনে তিনি ঘুরছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। শোনা যায় তিনি পরিচালক পদে নির্বাচিত হলে বিজেএর চেয়ারম্যান হওয়ার আকাঙক্ষায় প্রচার প্রচারনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
অথচ দেশের এই আলোচিত ব্যবসায়ি দেশের ভিতর শীর্ষ ১০জন ঋণ খেলাপির অন্যতম। ঋণ প্রদানকারি ব্যাংকের খাতায় তিনি অদৃশ্য বনে গেছে। তাকে দেশের কোথাও খুজে পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু প্রকৃৃত পক্ষে এই ঋণ খেলাপি তার প্রতিষ্ঠানে অবস্থান করেই বহাল তবিয়াতে ব্যবসা পরিচালনা করে যাচ্ছে। দেখার যেন কেউ নেই।
আলোচিত এই ব্যবসায়ির বিরুদ্ধে খুলনার সাধারন পাট ব্যবসায়িদের অভিযোগ তিনি পাট ক্রয় করে কম মূল্যে পাট রপ্তানী করে। তার এই রপ্তানীর উদ্দেশ্য শ্রেষ্ঠ কাঁচা পাট রপ্তানীকারক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি পরপর দুইবার প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে শ্রেষ্ঠ কাঁচা পাট রপ্তানীকারক হিসেবে সম্মাননা পদক গ্রহন করেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে এমন পদক গ্রহন করা সত্যেও ঋণ প্রদানকারি ব্যাংকগুলো তাকে খুজে পাচ্ছে না। তিনি অদৃশ্য ।
জানাযায়, এক সময় ছোট পরিসরে ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা করতেন বগুড়ার টিপু সুলতান। ঢাকা ট্রেডিং হাউজের নামে সীমিত পরিসরে পণ্য আমদানি করতেন তিনি। ২০০৯ সাল থেকে অপ্রত্যাশিত উত্থান হয় তার। প্রায় এক ডজন ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পরিবহন ব্যবসায় নামেন। এ ব্যবসায়ীর মালিকানাধীন টিআর ট্রাভেলসের এসি-ননএসি বাসগুলো চলাচল করত ঢাকা থেকে বগুড়া, রংপুরসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন রুটে। কিন্তু সেসবই এখন দূর অতীত।
পরিবহন ব্যবসায় গিয়ে অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে ভোগ্যপণ্যের ব্যবসা। এখন প্রায় বন্ধ টিআর ট্রাভেলসের চলাচলও। ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী সব বাসের চলাচলই বন্ধ রয়েছে। ধুলো জমেছে টিআর ট্রাভেলসের কাউন্টারগুলোর দরজায়।বাছবিচার না করে জামানত ছাড়াই টিপু সুলতানকে ঋণ দেয়া ব্যাংকগুলো ঘুরছে আদালতপাড়ায়। জনতা ব্যাংকের ২৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় ২০১৬ সালের মার্চে দুদকের মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন টিপু সুলতান। এরপর জামিন পেয়ে লাপাত্তা। ঋণের নামে হাজার কোটি টাকা লুটকারী এ ব্যবসায়ীকে খুঁজে পাচ্ছে না অর্থায়নকারী ব্যাংকগুলো।
টিপু সুলতানের কাছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের। রূপালী ব্যাংকেরও রয়েছে ১১০ কোটি টাকার ঋণ। এর বাইরে টিপু সুলতানের কাছে ৯০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের (বিডিবিএল)। এছাড়া এ ব্যবসায়ীর কাছে এবি ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ ৭০ কোটি, এক্সিম ব্যাংকের প্রায় ১৫০ কোটি, সাউথইস্ট ব্যাংকের প্রায় ৫০ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৩০ কোটি, ইসলামী ব্যাংকের ৩ কোটি, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ২ কোটি, ইউসিবির ৩ কোটি ও প্রাইম ব্যাংকের ৩ কোটি টাকা। ঢাকা ট্রেডিং হাউজ লিমিটেড, টিআর স্পেশালাইজড কোল্ডস্টোরেজ এবং টিআর ট্রাভেলসের নামে ব্যাংকগুলো থেকে এ ঋণ নিয়েছিলেন টিপু সুলতান। যার প্রায় পুরোটাই এখন খেলাপি। এর মধ্যে অধিকাংশ ঋণই দেয়া হয়েছে জামানত ছাড়া। টিপু সুলতানের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের সম্ভাবনাও তাই ক্ষীণ।
জামানত ছাড়াই টিপু সুলতানকে ঋণ দেয়া হয়েছিল বলে জানান সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ব্যাংকের সাবেক এমডি মাহবুবুল আলমের মেয়াদে ওই ঋণ দেয়া হয়েছিল। ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণেই তিনি টিপু সুলতানকে ঋণ দিয়েছিলেন। ঋণের পুরো অর্থই এখন মন্দ মানের খেলাপি।
টিপু সুলতানের সঙ্গে ব্যাংকের যোগাযোগ আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, টিপু সুলতান কোথায় আছেন, কী করছেন সে ব্যাপারে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। তার নিযুক্ত আইনজীবী আদালতে মামলা পরিচালনা করছেন। টাকা আদায়ের জন্য আমরা টিআর ট্রাভেলসের তিনটি গাড়ি জব্দ করেছিলাম। কিন্তু পরিবহন শ্রমিক নামধারী সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে টিপু সুলতান সেগুলো ছাড়িয়ে নিয়ে গেছেন। টাকা আদায়ে অর্থঋণ আদালতে মামলা চলমান রয়েছে।
টিপু সুলতানকে ঋণ দিয়ে বিপত্তিতে আছে বিডিবিএল। ব্যাংকটির দ্বিতীয় শীর্ষ ঋণখেলাপি ঢাকা ট্রেডিং হাউজ ও পঞ্চম শীর্ষ খেলাপি টিআর স্পেশালাইজড কোল্ডস্টোরেজ। এ দুটি প্রতিষ্ঠানেরই চেয়ারম্যান টিপু সুলতান। এ দুই প্রতিষ্ঠানের কাছে বিডিবিএলের পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯০ কোটি টাকা। ২০১২ সালে সাবেক এমডি জিল্লুর রহমানের মেয়াদে এ ঋণ দেয়া হয়েছিল। তত্কালীন এমডির এলাকার হওয়ায় অবাধে ঋণ সুবিধা পেয়েছিলেন এ ব্যবসায়ী।
কোনো মাধ্যমেই টিপু সুলতানের নাগাল পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান বিডিবিএলের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনজুর আহমেদ। তিনি বলেন, বিডিবিএলের শীর্ষ গ্রাহকদের অন্যতম টিপু সুলতান। অথচ তিনি কোনোদিন আমার সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজন বোধ করেননি। সেলফোনে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পারিনি। লোক পাঠিয়েও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। মনে হচ্ছে, টিপু সুলতান অদৃশ্য লোক। টাকা আদায়ের জন্য অর্থঋণ আদালতে এরই মধ্যে মামলা করা হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ায় যতটুকু সম্ভব অর্থ আদায়ের চেষ্টা চলছে।
জনতা ব্যাংকের ২৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে ২০১৬ সালের মার্চে রাজধানীর মতিঝিল থানায় মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সে মামলায় ওই মাসেই খুলনার দৌলতপুর থেকে গ্রেফতার হন তিনি।

ফাইল ফটো

২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ব্যাংকটি থেকে এ অর্থ আত্মসাত্ করেন তিনি। সুদসহ তার কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের পাওনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। ঋণের পুরো অর্থ মন্দ মানের খেলাপি হয়ে যাওয়ায় মামলা করেছে ব্যাংকটি। ব্যাংকটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, টিপু সুলতানের কাছ থেকে এক টাকাও এখনো আদায় করা সম্ভব হয়নি।
ঋণের টাকা আদায়ে টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে এক্সিম ব্যাংকও। এ প্রসঙ্গে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়া বলেন, খেলাপি হয়ে যাওয়া ঋণের অর্থ আদায়ে এরই মধ্যে মামলা করা হয়েছে। আদালতের কয়েকটি ডিক্রি ব্যাংকের অনুকূলে এসেছে। আইনি প্রক্রিয়ায় জামানত রাখা সম্পদ ক্রোক করে নিলামে তোলা হবে।
বগুড়া শহরের দক্ষিণ চেলোপাড়া-নারুলী এলাকার মৃত মালেক মন্ডলের সন্তান টিপু সুলতান। মালেক মন্ডল ক্ষুদ্র পরিসরে পাটের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে বৈবাহিক সূত্রে অনেক দিন আগে থেকেই বসবাস করতেন খুলনার রেলিগেট এলাকায়।
ভোগ্যপণ্য ও পরিবহন খাতের ব্যবসায়ী হলেও খুলনায় টিপু সুলতানের পরিচিতি পাট ব্যবসায়ী হিসেবে। বেশি দামে পাট কিনে তা কম দামে রফতানি করে রাতারাতি খুলনার পাট ব্যবসায়ীদের মধ্যে পরিচিতি পান তিনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাট রফতানিতে স্বর্ণপদক পাওয়ার জন্য বাকিতে পাট কিনে এভাবে রফতানি করেছিলেন টিপু সুলতান। সে সময় বিতর্কিত এ ব্যবসায়ীকে উদারহস্তে ঋণ দিয়েছিল রূপালী ব্যাংকের দৌলতপুর শাখা। ঋণ হিসেবে দেয়া ব্যাংকটির ১১০ কোটি টাকা আর ফেরত আসেনি।
একের পর এক ব্যাংকঋণ খেলাপি হয়ে গেলেও খুলনায় টিপু সুলতানের জীবনযাপনে ছিল রাজকীয় হাল। পরিচিত মহলে নিজের অর্থবৃত্ত নিয়ে বাগাড়ম্বর করতেন টিপু সুলতান।
এ ব্যবসায়ীর মালিকানাধীন টিআর ট্রাভেলসের বিলাসবহুল বাস চলাচল করত ঢাকা থেকে বগুড়া, রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে। এছাড়া ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম রুটেও এ বাস চলাচল শুরু করেছিল। গতকাল রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কয়েক মাস আগেই গাবতলী এলাকায় থাকা টিআর ট্রাভেলসের কাউন্টারগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। এখন ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী টিআর ট্রাভেলসের কোনো কাউন্টার গাবতলীতে সচল নেই। একই সংবাদ নিশ্চিত হওয়া গেছে রংপুর শহর থেকেও। রংপুর বাসস্ট্যান্ডে থাকা টিআর ট্রাভেলসের কাউন্টার বন্ধ হয়ে গেছে। সেখান থেকে গাড়িটি আর চলাচল করছে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category