আজ বুধবার, ১২ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং, ২৮শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
রুমানার জয়ে খুশিতে আত্মহারা রুমানার মা এবং দুই বোন

এশিয়া কাপের ফাইনালে ম্যাচ সেরা খুলনার মেয়ে রুমানা

এইচ আর তানজিরঃ অষ্টম এশিয়া কাপের ফাইনালে বাংলাদেশকে উৎসবে ভাসালেন সালমা রহমানের টি-টুয়েন্টি দল। প্রশ্ন নেই, এটাই বাংলাদেশের মেয়েদের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবজনক ও ঐতিহাসিক কীর্তি। আর এই গৌরবজনক ও ঐতিহাসিক কীর্তি জয়ের মূল ভূমিকা রেখেছেন খুলনার মেয়ে রুমানা আহম্মেদ । ২২ রান খরচ করে ২ উইকেট- অল রাউন্ড পারফরম্যান্সে ম্যাচসেরার পুরস্কারটি উঠেছে রুমানার হাতে । আর এই জয়ের আনন্দে আত্মহারা রুমানার পরিবার । টিভির স্ক্রিনে টান টান উত্তেজনাকর এ ম্যাচের দিকেই তাকিয়ে ছিলেন তার মা জাহানারা বেগম । রুমানা তার মাকে সব সময় বলতেন মা আমি বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দলকে একটি উচ্চতায় নিয়ে যাবো। তিনি আবেগ জরিত কন্ঠে বলেন,আমার মেয়ে সব সময় আত্ম বিশ্বাস ছিল সে মহিলা ক্রিকেটে ভাল পারফরম্যান্স করবে । আজ অষ্টম এশিয়াকাপে রুমানা আত্ম বিশ্বাসের পারফরম্যান্স করে তার স্বার রেখেছে । আমরা পরিবার থেকে সব সময় ওকে উৎসাহ দিতাম যাতে রুমানা আরো আত্ম বিশ্বাসী হউক এবং দেশের জন্য গৌরব বয়ে নিয়ে আসে । আজ শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে ভারতকে হারিয়ে এশিয়ার রানী হয়ে গেলেন বাংলার বাঘিনীরা। ২২ রান খরচ করে ২ উইকেট- অল রাউন্ড পারফরম্যান্সে ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতে নিয়েছেন খুলনার খালিশপুরের নয়াবাটির মৃত শেখ হাতেম আহম্মেদের কন্যা রুমানা আহম্মেদ । এটাই বাংলাদেশের মেয়েদের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবজনক ও ঐতিহাসিক কীর্তি।
ক্রিকেটের প্রতি রুমানার ব্যাপক আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই। রুমানা নিজেই বলেন, ‘আমি যখন ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিই, তখন মোহামেডান ক্লাবের সঙ্গে আমার চুক্তি ছিল। প্রিমিয়ার লিগের খেলা আর ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা চলছিল একসঙ্গে। এমনও হয়েছে, আমি পরীক্ষার হল থেকে বের হয়ে বাসে উঠতাম ঢাকায় এসে খেলার জন্য। আবার খেলা শেষ করে বাসে উঠতাম খুলনা যাওয়ার জন্য। এ আসা-যাওয়ার মধ্যেই পড়তে হতো।’
রুমানা আহমেদের জন্ম ২৯ মে, ১৯৯১। খুলনা সিটির খালিশপুর নয়াবটি শেখ বাড়িতে জন্মগ্রহণকারী এ মহিলা ক্রিকেটার ডান হাতি ব্যাটসম্যান এবং ডান হাতি লেগ ব্রেক বোলার। রুমানা বাংলাদেশের সেরা মহিলা অলরাউন্ডারদের মধ্যেও অন্যতম। বাংলাদেশের মহিলা ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম ওডিআই হ্যাট্রিক করার বিরল কীর্তিগাথার রচয়িতা তিনি।
চার ভাই বোনের রুমানা সবার ছোট মেয়ে। তার বড় ভাই ইতালি প্রবাসী ইফতেখার হোসেন, বড় বোন গৃহিনী সেলিনা আহম্মেদ, আর ছোট বোন সুমনা আহম্মেদ গৃহিনী। বাবা ছিলেন পেশায় একজন ঠিকাদার। খুলনার রোটারি হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ইসলামিয়া কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছেন রুমানা আহমেদ। ছোটবেলায় খেলোয়াড় হওয়ার কথা নাকি তিনি কল্পনায়ও ভাবেননি। ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ ছিল। ভাইয়েরা টেপ টেনিস বল দিয়ে ক্রিকেট খেলতেন, তাদের সঙ্গে খেলতেন রুমানাও। মাধ্যমিকের পর মূলত ক্রিকেটের সঙ্গে তার সখ্য হয়। স্থানীয় কোচ ইমতিয়াজ হোসেনের কাছে প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করেন। একে একে জাতীয় লিগ, ক্লাব কাপের সিঁড়িগুলো পেরিয়ে জাতীয় দলে পা রাখেন তিনি।
কলেজের বন্ধুরা যখন উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে কোথায় পড়বে, কী করবে এসব নিয়ে ভাবছে, রুমানা তখন ক্রিকেট নিয়ে পুরোদমে ব্যস্ত। অনেকে পরামর্শ দিয়েছিল, ‘জাতীয় দলে খেলে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াটা কঠিন হয়ে যাবে। তুমি বরং পাস কোর্সে ভর্তি হও।’ কিন্তু রুমানা রাজি হননি। বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়ার ইচ্ছে ছিল তার। এ সময় নর্দান ইউনিভার্সিটি থেকে তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়, পূর্ণ বৃত্তিসহ পড়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। সুযোগটা হাত ছাড়া করেননি তিনি।
রুমানা আহমেদের ছোট বোন সুমনা জানান, খেলা শেষ হওয়ার পরই রুমানার সাথে কথা হয়। ও বেশ উচ্ছসিত এবং আনন্দিত যে ভারতের মত একটি দলের সাথে ফাইনালে খেলে আজ এশিয়াকাপ ছিনিয়ে এনেছে । রুমানা ম্যান অব দা ম্যাচ হওয়ায় আমাদের পরিবার খুব খূশি।
সুমনা জানান, রুমানার সাফল্যে তাদের বাবা শেখ হাতেম আহমেদ বেঁচে থাকলে অনেক খুশি হতেন। তিনি বলেন, এশিয়া কাপে ছয়বারের শিরোপা জয়ী ভারতকে তিন উইকেটে হারায় লাল-সবুজ প্রমীলা ক্রিকেট বাহিনী। এ জয়ের একজন অংশীদার আমার বোন রুমানা। এছাড়া এশিয়া কাপে ভারতের সঙ্গে দুই খেলায় ম্যাচ সেরা হয়েছে রুমানা। এ কারনে সুমানা বলেন, আমার তিন বোন এক ভাই। ছোটবেলা থেকেই ভীষণ ক্রিকেট পাগল ছিলো রুমানা। তার সফলতাও পেয়েছে।
মেয়ের এমন খুশির কথা জানতে চাই রুমানার মা জেহানারা বেগমের কাছে তিনি বলেন, রুমানা খেলা শেষ করে রুমে যেতে কল করেছিলো তখন বললো। মা আমি আরো আগে কল দিতে চেয়েছিলাম পারিনি তুমি কষ্ট পেয়েনা। আমি ম্যান অব দা ম্যাচ হেয়েছি আমি বলে বুঝাতে পারবো আমি কতটা আনন্দিত। তিনি আরো বলেন, রুমানা ছোট বেলা থেকেই খেলার প্রতি একটা আলাদা টান ছিলো। মূলত শখের বসেই খেলতে খেলতে ও জাতীয় টিমে চলে যায়। ওকে বলি বয়স তো অনেক হলো এবার বিয়ে কর। কিন্তু ও বলে মা বিয়ে করবো। আমার কাঙ্খিত লে পৌছানোর অপোয় আছি। সেগুলো আগে পুরন হোক তারপর বিয়ে করবো। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ক্রিকেট খেলার জগতে প্রতিটি কাপ আমি আমার ঘরে আনতে চাই আর দলের ক্যাপ্টেন হয়ে বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেটকে একটি ভালো অবস্থানে নিয়ে যাবো। তারপর আমি সংসার ধর্মে মনোযােগ দিবো। এছাড়াও তিনি আরো বলেন, আজ ওর বাবা থাকলে অনেক খুশি হতো। তিনি সবসময় ওকে খেলার বিষয়ে সবধরনের সাপোর্ট করতো। কোন সময় বাধা দিতেন না।
এদিকে এশিয়া কাপে শিরোপা জয়ে বাংলাদেশ দলের নেতৃত্বে থাকা সালমা খাতুনের বাড়িও খুলনায় হওয়ায় আনন্দে ভাসছেন গোটা খুলনাবাসী।

শেয়ার করুন
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিষয়ের আরো সংবাদ

ফেসবুকে দৈনিক তথ্য