November 14, 2018, 12:10 pm

মহনগরীতে চালাচ্ছে রমরমা শিক্ষা বাণিজ্য খানজাহান আলী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মহাবিদ্যালয়

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ শিক্ষা বাণিজ্য চলছে বেসরকারি পলিটেকনিকে। চাহিদা অনুযায়ী অবকাঠামো, শিক্ষা উপকরণ, শিকক্ষ না থাকলেও শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট সময় পেরোলেই পাস করে যাচ্ছে। কিছু না শিখেই পাচ্ছে সার্টিফিকেট। এ সার্টিফিকেট নিয়ে অনেকেই চাকরির জন্য দক্ষতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
তারা জানান, কয়েকটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে কার্যক্রম চলছে ৪ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা কোর্সের। নীতিমালা অনুযায়ী অনুমোদনের যোগ্য নয়, এমন কয়েকশ’প্রতিষ্ঠান অনুমোদন দিয়েছে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড। এছাড়া নিয়মিত পরিদর্শন বা নজরদারি না করেই পরিদর্শন হয়েছে বলে দেখানো হয়। বোর্ডের কর্মকর্তাদের অনৈতিক সুবিধা দিতে পারলেই তালিকার উপরের দিকে থাকা যায়। তাই প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে নজর নেই পলিটেকনিকগুলোর।
খুলনা মহানগরীর আনাচে কানাচে গড়ে ওঠা ২২টি পলিটেকনিক এর মধ্যে খানজাহান আলী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মহাবিদ্যালয় রয়েছে প্রতারনার শীর্ষে। এক সময়ে ভাড়া করা ভবনে প্রতিষ্ঠান চালালেও ১১বছর পর চালু করে নিজস্ব ভবনে। আর এই অট্টালিকা ভবনকেই পূজি করে করছে প্রতারণা সাধারন শিক্ষার্থীদের সাথে। অট্টালিকা ভবন ছাড়া আর তেমন কোন উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা নেই এ প্রতিষ্ঠানে। শিক্ষার মান ও বেশ নাজুক। গেলো মার্চ মাসে প্রকাশিত ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এই প্রতিষ্ঠানে পাশের হার মাত্র ৪১শতাংশ। মার্চে প্রকাশিক ফলাফলে দেখা যায় ৫ম,৭ম ও ৮ম সেমিষ্টারে পরীক্ষা দিয়েছে মাত্র ৪৮২জন এর মধ্য থেকে উর্ত্তীর্ণ হয়েছে ২০২জন, ব্যর্থ হয়েছে ২৫৪ জন আর ড্রপ হয়েছে ২৬ জন। যা শতকরা হিসেবে আসে ৪১.৯১%। প্রশ্ন উঠে পাশের হার এত খারাপ এবং শিক্ষা ব্যবস্থা নাজুক হওয়ার পরও এই ধরনেভ প্রতিষ্ঠান ৩ কোটি ১২ লাখ টাকা গ্রান্ড পায় কিভাবে?
যতটুকু জানা যায় খানজাহান আলী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মহাবিদ্যালয় তাদের এই অট্টালিকা ভবন চাকচিক্যতা দেখিয়ে আর বিভিন্ন কর্তাদের ম্যানেজ করে ৩ কোটি ১২ লাখ টাকা গ্রান্ড পেয়েছে। যেই টাকার সিংহ ভাগ খরচ করছে নামে বেনামে বিভিন্ন ইন হাউজ ট্রেনিং , বিদেশ সফর, শিক্ষা সফর সহ নানা কাজে। যেখানে তৈরী করছে ভৌতিক বিল। যার হিসেব খরচের তুলনায় আকাশচুম্বি। অথচ এই অনুদান দেওয়া হয়েছে কারিগরি শিক্ষার মানউন্নয়নে। প্রতিষ্ঠানের ল্যাব সহ আধুনিক সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য। যার কিছুই তারা করেনি গ্রান্ড প্রাপ্ত হওয়ার ২ বছরেও। বাস্তবিক অর্থে দেখা যায় এই প্রতিষ্ঠানে ১৬টি ট্রেড এর বিপরিতে রয়েছে মাত্র ৬টি ল্যাব। প্রতিষ্ঠানের ভিতর কম্পিউটার ল্যাবে সে কালে কয়েকটি ভাঙ্গা মনিটর দিয়ে চলছে কম্পিউটার, হার্ডওয়্যার এবং নেটওয়্যার্কিং ল্যাব। যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এছাড়াও অন্যান্য ল্যাবের প্রতিটিতেই সামান্য কিছু টুলস ছাড়া কিছুই নেই।
এ ব্যাপারে অত্র প্রতিষ্ঠানের উপাধ্যক্ষের সাথে কথা বললে তিনি জানান, আপনি এগুলো দেখার কে? যারা দেখার তারা দেখেই তো অনুমোদন দিয়েছে। আপনি বোর্ডের কর্মকর্তারদের সাথে কথা বলেন। আমরা যা করি তাদের ম্যানেজ করেই করি। আপনি যা খুশি লেখেন আমাদের তাতে কিছুই যায় আসে না।
আরো অভিযোগ রয়েছে এবং প্রমানিত এই প্রতিষ্ঠানটি স্কুল পর্যায়ে বিভিন্ন দালাল এর মাধ্যমে কমিশন ভিত্তিক লোভনীয় অফার দিয়ে ছাত্র ছাত্রী ভর্তি করিয়ে থাকে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফিসের টাকা নিয়েও হিসাবে কম দেখানোর অভিযোগ উঠেছে এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। পুরো টাকা পরিশোধ করলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ ২০১৪ সাল থেকে ভর্তি হওয়া প্রায় প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছে আরও ৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা দাবি করছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কলেজের অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির দায় তাঁদের কাঁধেই চাপানো হচ্ছে। অধ্যক্ষ দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে টাকা আদায়ে শিক্ষার্থীদের চাপ দিয়েছেন। বেতন হিসাবের খাতায় পরিশোধ থাকলেও প্রতিটি রসিদ দেখাতে না পারলে গরমিলের টাকা কিছুটা মওকুফের জন্য লিখিত আবেদন করতে বাধ্য করেছেন। তাতে শিক্ষার্থীদের দোষ স্বীকার করে নিতে হয়েছে।
সামগ্রীক বিষয়ে বোর্ডে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানই নীতিমালা মানছে না। নিয়মিত পরিদর্শন করলে ৯০ শতাংশ প্রতিষ্ঠানকেই বাতিল করতে হবে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠান এখনও সার্টিফেকেটধারী শিক্ষার্থী তৈরি করছে। আর আমাদের কিছু কর্মকর্তার সাথে তারা মিলে এই অনিয়ম করছে। এটার জন্য আসলে সকলকেই সোচ্চার হতে হবে। দুর্নীতি মুক্তভাবে কাজ করে একটি সঠিক পরিচালনার ভিতর আসতে হবে।
কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষে গঠিত হয়েছিল কারিগরি শিক্ষা বোর্ড। এ শিক্ষা বোর্ড ৪ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং, ডিপ্লোমা ইন এগ্রিকালচার, ডিপ্লোমা ইন টেক্সটাইল, ডিপ্লোমা ইন ফিশারিজ, ডিপ্লোমা ইন জুট টেকনোলজি কোর্স, ৩ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন হেলথ টেকনোলজি, ডিপ্লোমা ইন ফরেস্ট্রি, ২ বছর মেয়াদি দাখিল, ভোকেশনাল কোর্স অনুমোদন দিয়ে থাকে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীরা কি শিখে বের হয়, তার কোনো খোঁজখবর রাখে না কারিগরি শিক্ষা বোর্ড।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এটা সত্য যে সব প্রতিষ্ঠান নীতিমালা মানছে না। আমরা কারিগরি শিক্ষাকে ভালো অবস্থানে নিয়ে যেতে চাই। যেসব প্রতিষ্ঠান নীতিমালার শর্ত পূরণ করছে না, তাদের চিহ্নিত করা হবে এবং বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। যারা ভালো করতে পারবে না, সেগুলো বন্ধ করে দেয়া হবে। তবে কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নের জন্য সবার সহযোগিতা দরকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category