বিলাল হোসেন, শ্যামনগর : সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপকূলীয় অঞ্চলে ধান চাষে পানির সংকট দিন দিন কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মাঠজুড়ে সবুজ ধানের শীষ বের হওয়ার অপেক্ষা আবার কোথাও জমিতে ফাটল ধরে শুকিয়ে যাচ্ছে মাটি। কিন্তু প্রয়োজনের সময় জমিতে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ, বুড়িগোয়ালিনী, আটুলিয়া ঈশ্বরীপুর, রমজান নগর, নুরনগর, কাশিমাড়ী ইউনিয়নের কৃষকরা। সময়মতো সেচ দিতে না পারলে ধানের ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এতে উৎপাদন খরচ তুলতে না পারার পাশাপাশি ঋণের বোঝা বাড়ার শঙ্কাও করছেন অনেক কৃষক।
উপকূলীয় এলাকার কৃষি অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। এখানকার বহু পরিবারের জীবিকা নির্ভর করে ধান চাষের ওপর। বছরের পর বছর জমি চাষ, বীজ কেনা, সার প্রয়োগ, কীটনাশক ব্যবহার এবং শ্রমিকের মজুরি দিতে গিয়ে কৃষকদের উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করতে হয়। কিন্তু ধানগাছের বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পানির অভাব দেখা দিলে সেই বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়ে। বিশেষ করে যেসব জমিতে বিকল্প সেচের ব্যবস্থা নেই, সেসব জমির কৃষকদের দুর্ভোগ আরও বেশি।
ধান চাষে পানির গুরুত্ব অপরিসীম। ধানের জাত, জমির ধরন, আবহাওয়া এবং চাষের পর্যায় অনুযায়ী পানির চাহিদা পরিবর্তিত হয়। ধানের চারা রোপণ, কুশি গঠন, শীষ বের হওয়া এবং দানা গঠনের সময় পর্যাপ্ত আর্দ্রতা ও প্রয়োজনীয় পানি নিশ্চিত করা জরুরি। এসব পর্যায়ে পানির ঘাটতি দেখা দিলে ধানের বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে এবং ফলন কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
শ্যামনগর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী ১৭ হাজার ৯ হেক্টর জমিতে আমন ধান রোপন করা হয়েছে এর মধ্যে ২৫% জমিতে পানি সংকট দেখা দিয়েছে।
কুলতলী গ্রামের কৃষক তরুপশু সরদার, এই বছর সর্বপ্রথম ধান ক্ষেতে পানি সংকট দেখা দিয়েছে। ধান উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পানি পাওয়া না গেলে জমিতে দেওয়া সার ও অন্যান্য উপকরণের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ধানগাছ দুর্বল হয়ে পড়লে রোগবালাই ও পরিবেশগত চাপের প্রভাবও বাড়তে পারে। ফলে শেষ পর্যন্ত ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
উপকূলীয় অঞ্চলে ধান চাষের অন্যতম বড় সমস্যা হলো মাটি ও পানির লবণাক্ততা। শুষ্ক মৌসুমে মিঠাপানির প্রাপ্যতা কমে গেলে অনেক এলাকায় কৃষিকাজের জন্য উপযুক্ত পানি সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। নদী খাল কিংবা অন্যান্য উৎসের পানিতে লবণাক্ততা বেশি থাকলে তা জমিতে ব্যবহারের আগে স্থানীয় পরিস্থিতি ও পানির উপযোগিতা বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কৃষিকাজের জন্য খাল, পুকুর, জলাধার ও অন্যান্য পানির উৎস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু এসব উৎসে পর্যাপ্ত পানি না থাকা, খাল ভরাট হয়ে যাওয়া, পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা দুর্বল হওয়া কিংবা সেচ অবকাঠামোর অভাবে কৃষকেরা প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পান না।
ধান চাষের শুরুতেই কৃষকদের জমি প্রস্তুত বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের পেছনে অর্থ ব্যয় করতে হয়। এরপর জমিতে পানি ধরে রাখা বা সেচ দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত খরচ করতে হয়। পানির সংকট দেখা দিলে কোনো কোনো কৃষককে দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়, আবার কেউ কেউ পাম্পের মাধ্যমে সেচ দেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, যন্ত্রপাতি ও শ্রমের খরচ বেড়ে যেতে পারে। পানির অভাবে ফলন কমে গেলে কৃষকের আয়ও কমে যায়। ধানের বাজারদর ভালো না থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। অনেক কৃষক মৌসুমের শুরুতে ধারদেনা করে চাষাবাদ করেন। ফসল ঘরে তোলার পর সেই টাকা পরিশোধের পরিকল্পনা থাকে। কিন্তু ফলন কমে গেলে ঋণ পরিশোধ, পরিবারের খরচ মেটানো এবং পরবর্তী মৌসুমে চাষাবাদ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
দীর্ঘদিন উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষি নিয়ে কাজ করা লিডার্সের নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার বলেন,উপকূলীয় কৃষিকে টেকসই করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধানও জরুরি। কৃষকদের জন্য স্থানীয় পরিবেশের উপযোগী ধানের জাত নির্বাচন, পানি ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ এবং নির্ভরযোগ্য কৃষি পরামর্শ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া সমাধান কঠিন। এছাড়া উপকূলীয় কৃষির পানিসংকট মোকাবিলায় সাময়িক উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, খাল ও জলাধারের কার্যকর ব্যবস্থাপনা, সেচ অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং মিঠাপানির উৎস সংরক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
শ্যামনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা অলিউল ইসলাম বলেন, পানি সংকটে লবণাক্ততা ধানগাছের পানি ও পুষ্টি গ্রহণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে। এতে চারার বৃদ্ধি কমে যাওয়া, পাতার আগা শুকিয়ে যাওয়া, গাছ দুর্বল হয়ে পড়া এবং ফলন হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি হয়। একই সঙ্গে মাটির লবণাক্ততা ও সেচের পানির সংকট একসঙ্গে দেখা দিলে কৃষকদের সমস্যা আরও জটিল হয়ে ওঠে।
তবে সব উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার মাত্রা এক নয়। স্থানভেদে নদীর পানি, ভূগর্ভস্থ পানি ও মাটির বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হওয়ায় সমস্যার ধরনও আলাদা হতে পারে। তাই এলাকাভিত্তিক পরীক্ষা ও তথ্যের ভিত্তিতে সেচের পরিকল্পনা করা জরুরি। সামনে একটা নিম্নচাপ হওয়ার সম্ভাবনা আছে যদি হয় তাহলে কৃষকরা এই ক্ষতির মুখ থেকে রেহাই পাবে।
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ এস এম নজরুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শেখ তৌহিদুল ইসলাম
বার্তা সম্পাদকঃ মো: হুমায়ুন কবীর
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ ৩১ বি কে রায় রোড,খুলনা।
প্রধান কার্যালয়ঃ বাড়ি নং-২৮, রোড নং-১৪, সোনাডাঙ্গা আ/এ (২য় ফেজ) খুলনা থেকে প্রকাশিত ও দেশ প্রিন্টিং এন্ড পাবলিকেশন, ৪০ সিমেট্রি রোড থেকে মুদ্রিত।
যোগাযোগঃ ০১৭১৩-৪২৫৪৬২
ফোন : ০২-৪৭৭৭২১০০৫, ০২-৪৭৭৭২১৩৮৩
ই-মেইলঃ dailytathaya@gmail.com
কপিরাইট © দৈনিক তথ্য । সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত