বিলাল হোসেন, শ্যামনগর : চারদিকে লোনা পানির ঘের। কোথাও মাছ, কোথাও কাঁকড়া। এর মাঝেই ঘেরের উঁচু আইলজুড়ে সবুজের সমারোহ। লাউয়ের লতা মাচা বেয়ে উঠেছে, কোথাও শসা, ঢেঁড়স, মরিচ, বেগুন, পুঁইশাক কিংবা অন্যান্য মৌসুমি সবজি। দূর থেকে দেখলে মনে হবে ছোট্ট কোনো সবুজ বাগান। অথচ এই জায়গাটিই একসময় ছিল শুধুই ঘেরের পাড় উৎপাদনের হিসাবের বাইরে থাকা একটি অব্যবহৃত অংশ।
সেই অব্যবহৃত জায়গাকেই কাজে লাগিয়ে নতুন সম্ভাবনার পথ তৈরি করেছেন উপকূলের শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের বনবিবিতলা গ্রামের কৃষক রতিকান্ত মন্ডল।
ঘেরের আইলে সবজি চাষ করে তিনি শুধু পরিবারের জন্য বাড়তি খাদ্যের সংস্থান করছেন না বিক্রির মাধ্যমে তৈরি করছেন অতিরিক্ত আয়ের পথও। এ আয় দিয়ে ২ ছেলে মেয়েকে ভালো ভাবে লেখাপড়া করাতে পারছেন পাশাপাশি একটি বড় গরুর খামার ও গড়ে তুলেছেন। তার এই উদ্যোগ দেখে নতুন করে ঘেরের আইলে চাষ শুরু করেছেন আয়ুব আলী, আমিনুর গাজী, আঃ রহিম গাজী, আ: আজিজ গাজী মত অনেক কৃষক।
[caption id="attachment_45934" align="alignnone" width="300"]
0-4064x3048-0-0-{}-0-12#;illum:5 scene:0 humanIn:0;[/caption]
উপকূলীয় শ্যামনগরের কৃষি জীবনের সঙ্গে লবণাক্ততা ও চিংড়ি ঘেরের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীর নোনা পানি, জলাবদ্ধতা এবং মিঠা পানির সংকট কৃষিকে কঠিন করে তুলেছে। শ্যামনগরে কৃষি জমিতে লবণাক্ততার প্রভাব এবং চিংড়ি নির্ভরতার কারণে কৃষির পরিবর্তিত চিত্র উঠে এসেছে।
এই বাস্তবতার মধ্যেই রতিকান্তের ঘেরের আইলে সবজি চাষ যেন ভিন্ন একটি বার্তা দিচ্ছে। জমি কম হলে উৎপাদনের সুযোগ আছে, প্রয়োজন শুধু পরিকল্পনা ও সঠিক ব্যবস্থাপনা।
ঘেরের আইল সাধারণত মাছের ঘেরের চারপাশ ঘেরা, মানুষ ও মালামাল চলাচল এবং ঘের রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হয়। কৃষির হিসাবে অনেক সময় এই জায়গাকে আলাদা জমি হিসেবে বিবেচনাই করা হয় না। অথচ সেই আইলের মাটি, উঁচু অবস্থান এবং তুলনামূলকভাবে পানি নিষ্কাশনের সুবিধাকে কাজে লাগানো গেলে সেখানে নানা ধরনের সবজি উৎপাদন সম্ভব, রতিকান্ত সেই সম্ভাবনাটিই কাজে লাগিয়েছেন।
অল্প পরিসরে শুরু করা চাষ ধীরে ধীরে বিস্তৃত করেছেন তিনি। আইলের মাটি প্রস্তুত করে, জৈব উপাদান ব্যবহার করে এবং মৌসুম অনুযায়ী সবজি নির্বাচন করে চাষ করছেন। লতানো সবজির জন্য তৈরি করছেন মাচা। এতে মাটির জায়গা কম লাগে, আবার আইলের ওপরের অংশের সর্বোচ্চ ব্যবহারও করা যায়।
তার চাষ পদ্ধতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো একই জায়গায় মাছ ও সবজি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ ঘেরের পানিতে মাছ, আর ঘেরের পাড়ে সবজি। কৃষির ভাষায় এটি সমন্বিত উৎপাদনের একটি সহজ রূপ।
শ্যামনগরের কৃষকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ গুলোর একটি লবণাক্ততা। বর্ষায় বৃষ্টির পানিতে অনেক এলাকায় লবণাক্ততা কিছুটা কমে এলে সবজি চাষের সুযোগ বাড়ে। আবার শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততা বাড়লে ফসল উৎপাদন কঠিন হয়ে পড়ে। স্থানীয় কৃষি বাস্তবতা নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে ঘেরের পাড়ে মৌসুমি সবজি চাষের এই প্রবণতার কথা উঠে এসেছে।
শ্যামনগর উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য মতে, বনবিবিতলায় ৩০০ একর কৃষি জমি আছে তার মধ্যে ৫০ একর জমি হল ঘরের আইল। ১৫০ জন কৃষক বেসরকারি সংস্থা সিসিডিবির সহযোগিতায় ঘেরের আইলে সবজি চাষ করে সফলতা পেয়েছে।
রতিকান্ত মন্ডলের উদ্যোগ তাই বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বরং উপকূলের কৃষিতে ধীরে ধীরে জায়গা করে নেওয়া একটি বিকল্প ব্যবস্থার স্থানীয় উদাহরণ। একই জমিতে মাছ ও সবজি এক সময় ঘের মানেই ছিল শুধু মাছ। ঘেরের আইল ছিল মাছের ঘেরের সীমারেখা, এখন সেই ধারণা বদলাচ্ছে।
বনবিবিতলা গ্রামের কৃষক আইয়ুব আলী জানান, আমরা দীর্ঘদিন ধরে লবণ পানির কারণে শুধু মাছ চাষ করতাম কিন্তু বর্তমানে মাছ চাষের পাশাপাশি ঘেরের আইলে সাক-সবজি লাগিয়ে ভালো লাভবান হচ্ছি। এক্ষেত্রে আমাদের সহযোগী হিসেবে পাশে রয়েছেন সিসিডিবি বেসরকারি সংস্থা।
একই গ্রামের আব্দুল আজিজ বলেন, আমরা লবণ পানিতে চিংড়ি মাছের চাষ করতাম। সবজি চাষের চিন্তা আমাদের মধ্যে ছিল না। চিংড়ি চাষে প্রচুর লস হতো। রতিকান্ত দাদাকে দেখে আমরা ঘেরের আইলে সবজি চাষ করতে শুরু করলাম।
সিসিডিবি পিসিআরসিবি প্রকল্পের উপজেলা কো-অর্ডিনেটর স্টিভ রায় রুপন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা এবং স্থানীয় মানুষের অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সিসিডিবি-পিসিআরসিবি প্রকল্প শ্যামনগর উপজেলার বনবিবিতলা গ্রামের কৃষকদের নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরে উচ্চমূল্যের বাণিজ্যিক সবজি চাষের সম্ভাবনা বাড়াতে ১৫ জন কৃষককে বাজার সংযোগ বিষয়ক প্রশিক্ষণ, উন্নত সবজির বীজ এবং প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।
প্রকল্পের এই উদ্যোগের আওতায় কৃষকরা তাঁদের ঘেরের পাড়ে মিষ্টি কুমড়া, শসা, বরবটি, ঢেঁড়স, লাউ, চালকুমড়া ও চিচিঙ্গাসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের সবজি চাষ শুরু করেছেন। এ উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষকরা তাঁদের বিদ্যমান জমি ও ঘেরের পাড়কে কাজে লাগিয়ে আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি করছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় জলবায়ু পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কৃষি কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
শ্যামনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: ওয়ালিউল ইসলাম বলেন, রতিকান্তের সাফল্যের পেছনে যে বার্তা, রতিকান্তের গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক শুধু তিনি সবজি চাষ করে আয় করছেন এটা নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি এমন একটি জায়গাকে উৎপাদনের আওতায় এনেছেন, যেটিকে এতদিন মূল কৃষি জমির অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। উপকূলের প্রান্তিক কৃষকের কাছে এ বিষয়টির গুরুত্ব অনেক। কারণ এখানে কৃষকের হাতে জমি সীমিত। কোথাও জমি লবণাক্ত, কোথাও জলাবদ্ধ, আবার কোথাও চিংড়ি ঘেরের কারণে প্রচলিত কৃষির সুযোগ কম। ফলে বিদ্যমান সম্পদকে সর্বোচ্চ কাজে লাগানোই হতে পারে টিকে থাকার অন্যতম কৌশল। এই অঞ্চলের কৃষকরা ঘেরের আইলে সবজি চাষ করে সেটাই করেছেন।
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ এস এম নজরুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শেখ তৌহিদুল ইসলাম
বার্তা সম্পাদকঃ মো: হুমায়ুন কবীর
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ ৩১ বি কে রায় রোড,খুলনা।
প্রধান কার্যালয়ঃ বাড়ি নং-২৮, রোড নং-১৪, সোনাডাঙ্গা আ/এ (২য় ফেজ) খুলনা থেকে প্রকাশিত ও দেশ প্রিন্টিং এন্ড পাবলিকেশন, ৪০ সিমেট্রি রোড থেকে মুদ্রিত।
যোগাযোগঃ ০১৭১৩-৪২৫৪৬২
ফোন : ০২-৪৭৭৭২১০০৫, ০২-৪৭৭৭২১৩৮৩
ই-মেইলঃ dailytathaya@gmail.com
কপিরাইট © দৈনিক তথ্য । সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত