আলী আজীম, মোংলা : আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাগেরহাট-৩ (রামপাল-মোংলা) আসনে লেগেছে ভোটের দমকা হাওয়া। সভা-সমাবেশ, গণসংযোগ, উঠান বৈঠকসহ নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা। প্রচারপত্র বিলি করার মধ্য দিয়ে প্রার্থীরা ভোট প্রার্থনা করেন।
ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টায় নির্বাচনী মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তারা। দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি।
তবে ভোটারদের ভাষ্য, এবারের নির্বাচনে তাঁরা সৎ, যোগ্য ও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছতে পারেন এমন প্রার্থীকে বেছে নিতে চান।

এই আসনের ভৌগোলিক অবস্থান অর্থনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে রয়েছে মোংলা বন্দর, রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, মোংলা ইপিজেড, মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ অসংখ্য শিল্প কলকারখানা। সুন্দরবনেরও একটা অংশ রয়েছে মোংলার মধ্যে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেশি থাকায় রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে এই আসনের। এখানকার ভোটারদের চাহিদা নিরীহ ও শিল্পবান্ধব সংসদ সদস্য।
বিগত দিনের নির্বাচনি ফলাফল বিবেচনা করলে এই আসনকে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি বলা যায়। ১৯৯১ সাল থেকে প্রতিটি নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। ১৯৯১ সালে বিএনপি নেতা এএসএম মোস্তাফিজুর রহমানকে হারিয়ে তালুকদার আবদুল খালেক এই আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালেও তালুকদার আবদুল খালেক এই আসন থেকে নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট গঠন করায় এই আসন থেকে জামায়াত নেতা গাজী আবু বকর সিদ্দিক নির্বাচন করেন এবং তিনি তালুকদার আবদুল খালেকের কাছে হেরে যান। ২০০৮ সালে জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির অ্যাড. আবদুল ওয়াদুদকে হারিয়ে আবারও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তালুকদার আবদুল খালেক।
পরে খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য তালুকদার আবদুুল খালেক সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং উপনির্বাচনে তার সহধর্মিণী বেগম হাবিবুন নাহার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালে তালুকদার আবদুল খালেক এই আসন থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। পরে ২০১৮ সালের প্রথম দিকে খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের জন্য তালুকদার আবদুল খালেক আবারও সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন। একই বছর ৪ জুন উপনির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বেগম হাবিবুন নাহার। ২০১৮ সালের নির্বাচনে জামায়াতের নায়েবে আমির অ্যাড. আবদুল ওয়াদুদকে হারিয়ে আবারও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বেগম হাবিবুন নাহার।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনেও তালুকদার আবদুল খালেক এর সহধর্মিণী বেগম হাবিবুন নাহার এই আসন থেকে নির্বাচিত হন।
আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত রামপাল--মোংলা বাস্তব দৃশ্যপট এখন সম্পূর্ণই ভিন্ন। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের অনেকেই মাঠে নেই। আবার অনেকেই গ্রেপ্তার হয়ে রয়েছেন কারাগারে। অধিকাংশই রয়েছেন পলাতক কিংবা এলাকা ছাড়া। এমন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এ আসন নিজেদের দখলে নিতে মরিয়া বিএনপি।
তবে ছাড় দিতে নারাজ জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামী দলগুলো। প্রতিটি আসনেই বিএনপি ছড়াছড়ি থাকলেও একক প্রার্থী ঘোষণা দিয়ে সেদিক থেকে মাঠে কিছুটা হলেও সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে জামায়াতে ইসলামী।
রামপাল ও মোংলা উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে বাগেরহাট-৩ আসন গঠিত। বরাবরই এই আসন আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত ছিল।
এই আসন থেকে বার বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তালুকদার আব্দুল খালেক পরবর্তীতে তার সহধর্মিণী বেগম হাবিবুন নাহার। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তারা কেউ মাঠে নেই। কেউ পলাতক, কেউই বা কারাগারে। সংগত কারণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই দুর্গে হানা দিতে মরিয়া বিএনপিসহ অন্যান্য দল। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর ভোটের সমীক্ষা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তাই এই আসনটি কব্জায় নিতে মরিয়া হয়ে উঠছে প্রতিটি দল।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনী মাঠে আছেন বাগেরহাট জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি এবং সেভ দ্যা সুন্দরবন ফাউন্ডেশন-এর চেয়ারম্যান লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম।
অন্যদিকে সতন্ত্র হিসেবে আছেন বাগেরহাট জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সাংসদ (বাগেরহাট-২) বীর মুক্তিযোদ্ধা এম এ এইচ সেলিম। একক প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর বাগেরহাট জেলা নায়েবে আমির এ্যাডভোকেট মাওলানা শেখ আব্দুল ওয়াদুদ, ইসলামী আন্দোলনের শেখ জিল্লুর রহমান, জাতীয় সমাজ তান্ত্রিক দল (জেএসডি- রব) মো: হাবিবুর রহমান মাষ্টার।
আনুষ্ঠানিক প্রচারের ২য় দিনে জমে উঠেছে রামপাল-মোংলার ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন। সকাল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছড়াচ্ছে যেন তাদের কণ্ঠে। ভোটারদের মন জয় করতে নানা কৌশলে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন প্রার্থী ও তাদের কর্মীরা।
অনেকটা পাল্লা দিয়ে তারা ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে প্রচারে ব্যস্ত রয়েছেন। প্রধান সড়কসহ অলিগলিতে চলছে মাইকিং। গানে, কবিতায় ও ছড়ায় মাইকে নানা ভঙ্গিমা চলছে প্রচার। এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত কোথাও সামান্যতম নীরবতা নেই। চলছে মাইকিং, একটি ভোটের মূল্য আছে, ভোট দিবেন না যাকে তাকে, অমুক ভাই ভাল লোক জয়ের মালা তারই হোক, আল্লাহ যদি থাকে সহায় অমুক মার্কার হবে জয়।
তবে, এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, বিপুলসংখ্যক নারী কর্মী নিজ নিজ প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে নেমেছে। প্রার্থীদের পরিবারের কোন মহিলা সদস্যই ঘরে বসে নেই। সকাল হতেই তারা দল বেঁধে প্রচারে বেরিয়ে পড়ছেন। ঘুরছেন পাড়ায় পাড়ায়, ভোটারদের বাড়ি বাড়ি। এ পর্যন্ত কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে চলছে প্রচার-প্রচারণা।
লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের মানুষ তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। ইনশাআল্লাহ, এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে রামপাল ও মোংলার মানুষ তাদের প্রিয় প্রতীক ধানের শীষ-এ ভোট দিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করবেন। নির্বাচিত হলে এই অঞ্চলের উন্নয়ন এবং সুন্দরবন সংলগ্ন মানুষের জীবনমান উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করবেন বলেও জানান তিনি।
উল্লেখ্য, লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বাগেরহাট জেলা বিএনপির অন্যতম সহ-সভাপতি এবং সেভ দ্য সুন্দরবন ফাউন্ডেশন-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দীর্ঘ দিন ধরে এলাকায় আর্তসামাজিক ও পরিবেশ রক্ষায় কাজ করে আসছেন। এলাকায় তার বিশেষ জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
জামায়াতের বাগেরহাট জেলা নায়েবে আমির অ্যাডভোকেট মাওলানা শেখ আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, বাংলাদেশ সব ধর্মের মানুষের দেশ। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান সবাই মিলেই এ দেশ গড়ে তুলেছে। ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষায় আমরা সব সময় সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছি।
জামায়াতের এই নেতা আরো বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, দখলবাজি ও অনিয়মের রাজনীতি বন্ধ করে মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সৎ, দক্ষ ও আদর্শবান নেতৃত্ব প্রয়োজন। জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে সব নাগরিক সমান অধিকার ও ন্যায়বিচার পাবে—এটাই আমাদের অঙ্গীকার।
উপদেষ্টা সম্পাদকঃ এস এম নজরুল ইসলাম
সম্পাদক ও প্রকাশকঃ শেখ তৌহিদুল ইসলাম
বার্তা সম্পাদকঃ মো: হুমায়ুন কবীর
বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যালয়ঃ ৩১ বি কে রায় রোড,খুলনা।
প্রধান কার্যালয়ঃ বাড়ি নং-২৮, রোড নং-১৪, সোনাডাঙ্গা আ/এ (২য় ফেজ) খুলনা থেকে প্রকাশিত ও দেশ প্রিন্টিং এন্ড পাবলিকেশন, ৪০ সিমেট্রি রোড থেকে মুদ্রিত।
যোগাযোগঃ ০১৭১৩-৪২৫৪৬২
ফোন : ০২-৪৭৭৭২১০০৫, ০২-৪৭৭৭২১৩৮৩
ই-মেইলঃ dailytathaya@gmail.com
কপিরাইট © দৈনিক তথ্য । সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত