আজ মঙ্গলবার, ১৬ই জুলাই, ২০১৯ ইং, ১লা শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

হযরত শাহজালাল (রহ) এর শৈশব ও ভারতবর্ষে আগমন এবং সিলেট বিজয়ের বিস্ময়কর কাহিনী

মক্কার ঐতিহ্যবাহী ও অভিজাত কুরাইশ বংশের একটি শাখা ধনে, জ্ঞানে, শিক্ষা দীক্ষায় ও মানে গৌরবে তৎকালে খুবই প্রসিদ্ধ ছিল। ধর্ম পালন, ন্যায় নীতি ও সততার আশ্রয় অবলম্বন ঐ কুরাইশ শাখাটির বৈশিষ্ট্য ছিল। একবার ঐ কুরাইশ শাখার বেশ কিছু পরিবার তাহাদের জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে হেজাজের দক্ষিণ পশ্চিম সীমান্তে ইয়ামেন প্রদেশে চলে গেল এবং সেখানেই বসবাস শুরু করল। যারা মক্কা হতে ইয়েমেনে চলে আসল, তাদের মধ্যে শায়খ মাহমুদ ছিলেন এক উল্লেখ্যযোগ্য ব্যক্তি। তিনি কিছুদিন ইয়ামেনে অবস্থান করার পর তাঁর পরিবার পরিজন নিয়ে সেখান হতে তুরস্ক চলে যান এবং তথাকার কুনিয়া নামক এক ক্ষুদ্র শহরে গিয়ে বসতি স্থাপন করেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, শায়খ মাহমুদ যখন ইয়ামেন হতে তুরস্ক গমন করেছিলেন তখন যদিও তিনি বিবাহিত ছিলেন কিন্তু তার কোনো সন্তান সন্তুতি ছিল না।তিনি নিজে যেমন মক্কার অভিজাত কুরাইশ বংশোদ্ভুত ছিলেন, তেমনি তিনি বিবাহও করেছেন কুরাইশ বংশের এক শরীফ নারীকে। এ নারী নানাগুনে বিভূষিতা ছিলেন। সততা, সত্যবাদিতা, নম্রতা, পবিত্রতা, বুদ্ধিমত্তা প্রভৃত গুণে তিনি তৎকালীন কুরাইশ নারীদের মধ্যে ছিলেন অন্যতম। শায়খ মাহমুদও ইসলাম প্রচার কার্যে একনিষ্ঠভাবে নিয়োজিত ছিলেন।

শায়খ মাহমুদ ইয়েমেন হতে যখন সস্ত্রীক  তুরস্কের কুনিয়া নামক ছোট শহরে এসে বসবাস আরম্ভ করেন তখনও পর্যন্ত তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। বিবাহের পর দীর্ঘদিন এভাবে সন্তান সন্তুতি লাভ না করায় শায়খ মাহমুদ দম্পতি পারিবারিক জীবনে সত্যিই এক অভাব অনুভব করেছিলেন। এজন্য তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনই অন্তত একটি সন্তান লাভের জন্য আল্লাহর দরবারে নিয়তই প্রার্থনা করতেন। অচিরেই আল্লাহর দরবারে শায়খ ও তার স্ত্রীর মিনতি কবুল হল। শায়খ মাহমুদ পত্নী শীঘ্রই গর্ভে সন্তান ধারণ করলেন। ১২৭১ খ্রিস্টাব্দে শায়খ মাহমুদ – পত্নী অতুলনীয় সুন্দর একটি পুত্র সন্তান প্রসব করলেন। সদ্য ভূমিষ্ট সন্তানের রুপ দর্শন করে পিতা মাতার চোখ জুড়িয়ে গেল এবং তাদের অন্তর ভরে গেল। আল্লাহর অফুরান্ত দয়ার উসিলায় সন্তান লাভ করার ফলে তাদের মনে সীমাহীন খুশি ও আনন্দ। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় কত যে দান খয়রাত করলেন ও গরীবকে ভোজন করালেন তার হিসাব নেই।

শিশু জালালের বয়স যখন তিন মাস অতিক্রম করছে (সম্ভবত তৃতীয় মাসের একুশতম দিনে ) জালালের মাতা ভোর হতেই মাথায় তীব্র যন্ত্রনা অনুভব করলেন এবং সাথে সাথে বেশ সর্দি কাশিরও প্রকোপ ছিল। সারাদিন ঐ ভাবে কাটার পর রাতে ভীষন জ্বর দেখা গেল। এর পাঁচ ছয়দিন পরেই শিশুপুত্রকে রেখে ইহজগত ত্যাগ করলেন তিনি। অসময়ে এ শোকাবহ ঘটনার ফলে শায়খ মাহমুদ একদিকে যেমন পত্নী শোকে মুহ্যমান হলেন অন্যদিকে মাতৃহারা শিশু সন্তানকে নিয়ে তিনি দারুন ভাবনায় পড়লেন। যেভাবেই হোক, তিনি পরম স্নেহে ও সাধ্যাতীত যত্ন চেষ্টায় পুত্র জালালের লালন ও সবরকম তত্ত্বাবিধান নিজেই করতে লাগলেন। দিন বয়ে যাচ্ছিল।ইতোমধ্যে প্রায় ৫ বছর অতিক্রান্ত হল। সে যে মাতৃহারা তা সে এখন বেশ ভাল করে বুঝে।  গৃহে তার অভিভাবক ও আপনজন একমাত্র পিতাকেই জানে। দিবা রাত্রির প্রায় প্রতিটি মুহুর্ত ছায়ার মত পিতার নিকটেই থাকেন।সুযোগ্য পিতা যখন হতে পুত্রের মুখে কথা ফুটেছে,তখন হতেই তাকে যথাযোগ্য গড়ে তুলবেন,মনে এ আশা নিয়ে শিক্ষা দিতে শুরু করলেন।

হঠাৎ খবর রটল রাজ্যের সীমান্ত  এলাকায় মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফিররা যুদ্ধের আয়োজন করছে। তাদের মোকাবেলায় নিয়মিত মুসলিম বাহিনী  প্রস্তুত হল, কিন্তু  কাফিরদের শক্তির অনুপাতে মুসলমানদের আরো সৈনিক শক্তি প্রয়োজন হওয়ার ফলে দেশের অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক এবং অন্যান্য প্রধান বিচক্ষণ  বীর মুজাহিদগনেরও জিহাদে শরীক হওয়ার আহবান আসল। শায়খ মাহমুদ শিক্ষা- দীক্ষা লাভের সাথে সাথে যুদ্ধ বিদ্যায়ও পারদর্শিতা লাভ করেছিলেন। সুতরাং ধর্মযুদ্ধে যোগদানের জন্য তার নিকট ও বিশেষ আহবান পত্র পৌছাল। যেখানে প্রিয় ইসলাম বিপন্ন সেখানে তিনি পুত্রের নিরাপত্তা রক্ষার উদ্দেশ্যে গৃহের কোনে লুকিয়ে থাকাকে ধর্ম বিরোধী কার্য বলে মনে করলেন। সুতরাং যুদ্ধের ডাক আসা মাত্রই তিনি মুসলিম বাহিনীতে যোগদানের জন্য প্রস্তুতি গ্রহন করলেন এবং তার এক প্রতিবেশীর নিকট পুত্র জালালের দায়িত্ব সমর্পন করে মুসলিম সেনাবাহিনীতে যোগদানের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলেন।

কুনিয়া শহর হতে বেশ কিছু সংখ্যক মুজাহিদ যুদ্ধে শরীক হয়েছিল। যুদ্ধে জয়লাভ করে তারা প্রায় সকলেই ফিরে এসেছে। কিন্তু শায়খ মাহমুদ প্রত্যাবর্তন করলেন না। জিহাদ হতে প্রত্যাগত মুজাহিদগনের মুখে শুনা গেল -তিনি জিহাদের ময়দানে বীরত্বের সাথে লড়াই করে অবশেষে শাহাদাত বরন করেছেন। পাঁচ বছরের শিশু জালাল উদ্দীনের কানেও তার পিতার শাহাদাতের কথাটি পৌছেছিল কিন্তু সে তখন এ কথার অর্থ  বুঝতে পেরেছিল কি না বলতে পারি না। আল্লাহ কি তার প্রিয় বান্দাদের শৈশবেই এতিম করে দেন? যেমন এতিম হয়েছিলেন আল্লাহর প্রিয় হাবিব, মহানবী হযরত মুহম্মদ (সঃ)।

জালাল উদ্দীনের মামা সৈয়দ আহমদ কবীর সুহরাওয়ার্দী ছিলেন সেসময়ের প্রসিদ্ধ আলেম। ইনি কুনিয়া হতে বেশ কিছু দূরে তুরস্কের অন্য এলাকায় বাস করতেন। সুতরাং কুনিয়ায় বসবাসরত তার বোন অর্থাৎ শায়খ মাহমুদের স্ত্রীর মৃত্যু খবর তিনি জানতে পারেননি। দীর্ঘদিন ধরে তাদের পরস্পরের মধ্যেকোনরুপ যোগাযোগ বা আসা যাওয়া ছিল না। ভগ্নির মৃত্যুর প্রায় পাঁচ বছর পর তাঁর ভগ্নিপতির জিহাদে শাহাদাত বরণের কথা তদঞ্চলের মুজাহিদগনের নিকট তিনি জানতে পারলেন। এসময় তিনি তার জনক, জননীহারা ইয়াতিম ভাগ্নেটির কথাও তাদের কাছে শুনা মাত্রই কুনিয়া অভিমুখে রওনা হলেন। কুনিয়া পৌছে তিনি জালালকে নিয়ে স্বীয় বাসস্থানে ফিরলেন।শায়খ মাহমুদ কুনিয়া বাসীর নিকট পরম শ্রদ্ধেয় মুরুব্বী ছিলেন, আর জালালউদ্দীনের মামা আহমদ কবীর একজন উচ্চ পর্যায়ের আলেম, জ্ঞানী ও পরহিতৈষী ব্যক্তি ছিলেন। তাই কুনিয়া বাসীর অনুরোধে তিনি ওয়াদা করলেন যে, শিশু জালালকে নিয়ে স্বীয় বাসস্থানের ফিরে, স্বপরিবারে কুনিয়া প্রত্যাবর্তন করবেন। তিনি তার প্রতি শ্রুতি রেখেছিলেন। জালালউদ্দিনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব সে নিজের মাথায় তুলে নেয়। ধর্মীয় শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্বদিয়ে তিনি তাকে প্রথমে আরবী সবক দেন। মাত্র ছয় বছর বয়স কালে তিনি নিয়মিত নামায আদায় করতেন। বালক জালাল ছিলেন পতার সমস্ত গুনের ধারক। একদিনে তিনি যেমন ছিলেন পরম বিদ্যোৎসাহী,  অন্যদিকে পরম ধীশক্তিসম্পন্ন। মামা আহমেদ কবীর তার তীক্ষ্ণ জ্ঞান আর অভূতপূর্ব বিচক্ষণতার দ্বারা তারা উজ্জ্বল ভবিষ্যত আন্দাজ করেছেন। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি সমগ্র কোরআন শরীফ মুখস্ত করে শ্রেষ্ঠ হাফেজে পরিণত হন। সাথে ইসলামি শিক্ষার বিভিন্ন শাখা যথা – কুরআন, হাদিস, তাফসীর, ফেকাহ, আকায়েদ, আদব ও অন্যান্য শাস্ত্রসমূহ অধ্যয়ন আরম্ভ করলেন। মাত্র ষোল বছর বয়সে জালাল উল্লেখিত শাস্ত্রগুলোর গভীর জ্ঞানের অধিকারী হলেন। এভাবে মাত্র অল্পকিছুদিনের মধ্যেই জালাল মারফাতের সব সিড়িগুলো অতিক্রম করে বেলায়েতের আসন লাভ করলেন। পরবর্তিতে আহমদ কবীর শাহ জালালকে ইয়েমেন থেকে মক্কায় নিয়ে যান। মক্কা শহরে আহমদ কবীরের একটি আস্তানা (হোজরা) ছিল। সেখানে অন্যান্য শিষ্যদের সাথে শাহ জালালকেও উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন বলে জানা যায়।

কথিত আছে একদিন শাহ জালাল অভ্যাসানুরুপ উন্মুক্ত প্রান্তরে পায়চারী করতে করতে পার্শ্বস্থ বনভূমির দিকে অগ্রসর হলে তিনি দেখলেন, শ্বেত ধবধবেপোশাক পরিহিত প্রশান্ত ও সৌম্য দর্শন এক মহাসাধক ব্যক্তি বের হয়ে তাঁকে বললেন, দাড়াও। দরবেশ তার নামোচ্চারণ করে বললেন জালাল! তুমি হা করো, দরবেশ লোকটি তার নিজের মুখের খানিকটা লালা বের করে শাহ জালালের জিহ্বায় তা ঘষে দিলেন। যাবার কালে তিনি বললেন “আমি তোমার জন্য মাবুদের দরবারে মোনাজাত করেছি, তিনি যেন তোমার জীবন সার্থক ও ধন্য করে দেয়। প্রস্থানের সময় তিনি পরিচয় দিয়ে বললেন, “আমি খাজা খিজির ” তার পবিত্র মুখের লালার ক্রিয়া ও দোয়ার প্রভাবই হযরত শাহ জালালের জীবনের পথের প্রধান সহায়করুপে ভূমিকা রেখেছিলেন।

একদিন এক ঘটনা ঘটল। হযরত শাহ জালাল (রহঃ) এবাদত বন্দেগী ও মোরাকাবা, মোশাহাদা সমাপ্ত করে তন্দ্রাভিভূত হলেন। তখন রাত্রি দ্বিপ্রহর। তিনি স্বপ্নযোগে দেখতে পেলেন সৌম্যদর্শন  ও অত্যুজ্জ্বল কান্তিবিশিষ্ট এক মহাপুরুষ তার কক্ষে সমাগত। তার পরিধানে অজানুলম্বিত, শুভ্র পরিচ্ছেদ, মস্তিষ্কে উষ্নীষ এবং সুন্দর শুভ্র শ্মশ্রুমন্ডিত সহাস্যবদন, চেহরা হতে আলোকরশ্মি বিচ্ছুরিত হচ্ছে। মহাপুরুষ ত্কে লক্ষ করে বলল, ” হে শাহ জালাল, এ তরুন বয়সে তোমার অপূর্ব সাধনা, ত্যাগ, তিতিক্ষা, আত্নসংযম ও আল্লাহর প্রেমে আত্নবিস্মৃতির দৃশ্য দেখে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি। আল্লাহ তোমার উপর খৃশি হয়ে তার প্রিয় বান্দাগনের দপ্তরে তোমার নাম লিখিয়েছেন। তোমার ভেতর এখন যে যোগ্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে তোমাকে মানুষের খেদমতে অবতীর্ণ হতে হবে। তুমি আমার প্রতিনিধি হিসেবে ভারতবর্ষ তথা হিন্দুস্থানে গমন করবে। তোমার প্রতি এটাই আমার নির্দেশ। হযরত শাহ জালালের (রহঃ) নিদ্রা ভঙ্গ হল। স্বপ্ন দেখে তিনি আনন্দে আত্নহারা হয়ে গেলেন। নামাযে দাঁড়ানোর পূর্বেই তিনি মামার নিকট স্বপ্নের আদ্যোপান্ত বিবৃত করলেন। অতঃপর তিনি ভাগিনাকে হিন্দুস্থান প্রেরনের জন্য মনঃস্থির করে এক মুষ্ঠি মৃত্তিকা প্রদান করে বললেন। যেখানকান মাটির রং ও গন্ধএর সাথে মিলে যাবে সেটাই তোমার গন্তব্যস্থান। তিনি শাহ জালালের সহচররুপে প্রথম শ্রেণির বারোজন অলী মনোনীত করলেন। পথে পথে তার আধ্যাত্নিক সাধনায় মুগ্ধ হয়ে তার অনুসারীর সংখ্যা বাড়তে থাকলো।যখন দিল্লী পর্যন্ত এসে পৌঁছালেন তখন শিষ্যদের সংখ্যা ২৪০ জন ছিল বলে জানা যায়।

সেসময় দিল্লীর প্রসিদ্ধ আলেম ও আধ্যাত্নিক ধর্মগুরু ছিলেন হযরত নিজামউদ্দীন(রহঃ)। দিল্লিতে আসার পর নিজামুদ্দিন আউলিয়ার জনৈক শিষ্য গুরুর কাছে শাহ জালালে সম্পর্কে কুত্সা রটনা করে। সঙ্গে সঙ্গে নিজামউদ্দীন (র) অন্যের কুত্সা রটনাকারী এ শিষ্যকে উপযুক্ত শাস্তিস্বরূপ দরবার থেকে তাড়িয়ে দেন এবং অন্য দুই শিষ্যকে ডেকে তাদের মারফতে শাহ জালালের কাছে সালাম পাঠান । শাহ জালাল সালামের উত্তরে উপটৌকনস্বরূপ ছোট একটি বাক্সে প্রজ্জলিত অঙ্গারের মধ্যে কিছু তুলা ভরে নিজামুদ্দীন আউলিয়ার নিকট পাঠান। নিজামুদ্দিন আউলিয়া হযরত শাহ্ জালালের আধ্যাত্মিক শক্তির পরিচয় পেয়ে তাঁকে সাদরে সাক্ষাতের আমন্ত্রণ জানান। বিদায়কালে প্রীতির নিদর্শনস্বরূপ নিজামুদ্দিন আউলিয়া তাঁকে এক জোড়া সুরমা রঙের কবুতর উপহার দেন।  কবুতর জোড়া তিনি পোষা পাখির মত পুষতে লাগলেন। মাজার সংলগ্ন এলাকায় সুরমা রঙের যে কবুতর দেখা যায় তা ঐ কবুতরের বংশধর। যা জালালী কবুতর নামে খ্যাত। এদিকে সিলেটের বহু গৃহস্থেরর বাড়ীতে এ কবুতর দেখা যায়। স্বল্পদিনেই এ কবুতর সংখ্যায় বহু হয়ে যায়। এদের মাংস খাওয়া হয় না। এ কবুতর কোথাও বাসা বাধলে তা শুভ লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়।

শাহজালাল
সিলেটে শাহজালাল (র) এর মাজারে জালালী কবুতর

হযরত শাহ জালাল (রহঃ) যখন সিলেটে আগমন করে তখন রাজা গৌড় গোবিন্দের শাসন চলছিলো। তারমত নিষ্ঠুর অত্যাচারী ও পরধর্মবিদ্বষী শাসক ইতিহাসে খুব কম। তার নিষ্ঠুরতার পরিমাপ এক ঘটনার মাধ্যমেই করা যায়। সিলেটে শেখ বুরহানুদ্দীন নামের এক ধার্মিক লোক বাস করতেন। আল্লাহ তাকে কোনোকিছুতে কমতি না দিলেও একজন সন্তানের আফসোস তার ঘুচল না। একরাতে তিনি ও তার স্ত্রী আল্লাহর নিকট এক সন্তান ভিক্ষা চাইলেন, বিনিময়ে এক গরু কোরবানির মানত করলেন। আল্লাহ তাদের প্রার্থনা কবুল করলেন কিন্তু সিলেটে গরু জবেহ করে মানত পূরণ তাদের জন্য অসম্ভব ছিলো। তাদের কোলজুড়ে এক পুত্রসন্তান আসলো।শেষমেশ অতি গোপনে তারা কোরবানি সম্পন্ন করতে চাইলেন কিন্তু চিল একটু মাংস মুখে করে নিয়ে রাজদরবারে ফেলে রেখে যায়।তা গৌড়গোবিন্দের নজর এড়িয়ে যায় নি। তিনি বুরহানুদ্দীনেরর নবজাতক পুত্রকে বলির নির্দেশ দেন এবং বুরহানুদ্দীনের হাত কব্জি পর্যন্ত কেটে ফেলার নির্দেশ দেন।

সিলেটের নাম তখন শ্রীহট্ট। অধিকাংশ নাগরিকই হিন্দু ধর্মের অনুসারী। সেসময় এই শ্রীহট্টের রাজা ছিলেন গৌড় গোবিন্দ। গৌড় গোবিন্দ ছিলেন কট্টর হিন্দু ও অত্যাচারী শাসক। অন্য ধর্মের প্রতি ছিলেন চরম অসহিষ্ণু। বাংলার অনেক জায়গাতে ইসলামের প্রসার হলেও গৌড় গোবিন্দের কারনে সিলেট অঞ্চলে তখনো অতি অল্প কিছু নাগরিক ছিল মুসলিম। এরমধ্যে ছিলেন শেখ বুরহান উদ্দিন নামে একজন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক। কিন্তু তার কোন সন্তান হচ্ছিল না। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন একটা সন্তানের জন্য। মানত করেছিলেন সন্তান হলে আল্লাহর উদ্দেশ্যে গরু জবাই দিয়ে প্রতিবেশীদের খাওয়াবেন। একসময় তাঁর প্রার্থনা কবুল হল। বুরহান উদ্দিনের ঘরে জন্ম নিল এক পুত্র সন্তান। মানত অনুযায়ী এবার গরু কুরবানি দেয়ার পালা। কিন্তু কট্টর হিন্দু রাজা গৌড় গোবিন্দের এলাকায় গরু জবাই করা নিষিদ্ধ। তবুও আল্লাহর কাছে মানত করেছেন (অন্যমতে আকিকা উপলক্ষে গরু জবাই দিয়েছিলেন), দীর্ঘ আকাঙ্খিত সন্তান পেয়েছেন তাই গোপনে গরু কুরবানি দিয়েই ফেললো বুরহান উদ্দিন।

কিন্তু সেটা গোপন থাকলো না। এই কথা চলে গেল গৌড় গোবিন্দের কানে। কথিত আছে কোন এক কাকের মুখ থেকে এক টুকরো মাংস গৌড় গোবিন্দের রাজ প্রাসাদে পড়ে যায়। এবং এখান থেকেই গরু জবাই হওয়ার কথা প্রকাশ পায়।

গৌড় গোবিন্দ তল্লাশি করে বের করলেন গরু জবাই করা ব্যক্তিকে। গ্রেফতার করলেন বুরহান উদ্দিনকে। গরু জবাই নিষিদ্ধ থাকার পরেও কোন সাহসে সে একাজ করলো জানতে চাইলে বুরহান উদ্দিন জানালো তার সন্তান ও মানত বিষয়ক (বা আকিকা) কারন।  নিষ্ঠুর রাজা গৌড় গোবিন্দ বুরহান উদ্দিনের শিশু সন্তানকে এনে হত্যা করলেন।

যে হাত দিয়ে বুরহান উদ্দিন গরু জবাই করেছেন সে হাত কেটে দিলেন।

শোকার্ত ও ক্ষুব্ধ বুরহান উদ্দিন গেলেন বাংলার তৎকালীন শাসক শামস উদ্দীন ফিরোজ শাহের নিকট। জানালেন এই নিষ্ঠুরতার কথা এবং শোনালেন গৌড় গোবিন্ধের অত্যাচার, নির্যাতন ও ইসলাম বিদ্বেষের কথা। ফিরোজ শাহ সব শুনে তাঁর ভাগ্নে সিকান্দর গাজীর নেতৃত্বে সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করেন গৌড় গোবিন্দকে পরাজিত করে সিলেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে। (বুঝার সুবিধার্থে শ্রীহট্ট না লিখে লেখায় সিলেট শব্দটিই ব্যবহার করা হচ্ছে)

গৌড় গোবিন্দ ছিলেন যাদুবিদ্যায় পারদর্শী। যাদুবিদ্যা দিয়ে শত্রুপুক্ষকে ঘায়েল করে দিতেন তিনি। গৌড় গোবিন্ধ তার যাদুবিদ্যা দিয়ে তাদের উপর অগ্নিবান নিক্ষেপ করেন। কোনভাবেই কুলিয়ে উঠতে পারছিল না মুসলিম সৈন্যরা। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হল সিকান্দার গাজীর বাহিনীর। অভিযানে ব্যর্থ হয়ে পিছু হটলেন সিকান্দার গাজী। ফিরে এসে জানালেন গৌড় গোবিন্দের যাদুশক্তির কথা। স্বাভাবিক যুদ্ধের পথে তাকে পরাজিত করা যাবে না। অলৌকিক শক্তি দিয়েই তাকে পরাজিত করতে হবে।

মনঃকষ্ট নিয়ে বুরহান উদ্দিন চলে গেলেন দিল্লী।

গৌড়গোবিন্দের ইসলাম বিদ্বেষ, বুরহান উদ্দিনের সন্তান হত্যা ও সিকান্দার গাজীর অভিযানের ব্যর্থতার কথা জানতে পারেন দিল্লীর সুলতান আলাউদ্দিন খিলজী। শুনে ক্ষুব্দ হয়ে শক্তিশালী বাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। কিন্তু শ্রীহট্ট সিলেট এর চারপাশে নদী থাকায় এবং সে নদীর উপর গৌড় গোবিন্দের নিয়ন্ত্রণ ও তার কালো যাদুবিদ্যার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় আলেমরা। সাধারণ কোন সেনাপতির নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করে লাভ হবে না, পাঠাতে হবে অত্যন্ত ঈমানদার ও আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন কারো নেতৃত্বে! কিন্তু এমন কে আছে? কোথায় পাওয়া যাবে এমন সেনাপতি? কিছুদিনের মধ্যেই পাওয়া গেল এমন একজনকে। এবং সুলতানের বাহিনীর মধ্যেই।

একরাতে প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টিতে দিল্লী প্লাবিত হয়ে গেল, ব্যপক্ক ক্ষয়ক্ষতি হল, অন্ধকারে ঢেকে গেল পুরো নগরী। কোথাও কোন প্রদীপ জ্বালানোর উপায় নেই। কিন্তু ব্যতিক্রম হিসেবে দেখা গেল একটি তাঁবু। সেখানে আলো জ্বলছে। সবাই অবাক হয়ে সেখানে পৌঁছে দেখলো একজন সৈনিক একাগ্রচিত্তে কুরআন তেলাওয়াত করছেন। এই ঝড়বৃষ্টির মধ্যেও তাঁর ঘরে আলো জ্বলতে দেখে এবং কোনরকম উৎকণ্ঠা না দেখিয়ে একাগ্রচিত্তে কুরআন তেলাওয়াত করা দেখে সকলেই তাঁর ঈমানদারিতে অভিভূত হয়ে গেল। সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির কানে সংবাদ পৌছে গেল। সুলতান নিজ চোখে এসে দেখলেন। এ যে তার বাহিনীর একজন সাধারণ সৈনিক, সৈয়দ নাসির উদ্দিন। আলেমরা পরামর্শ দিলেন সৈয়দ নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালনা করতে। এতে রাজা গোবিন্দের যাদু বিদ্যার মোকাবেলা করে শ্রীহট্ট জয় করা সম্ভব হতে পারে। সুলতান সম্মতি দিলেন। সৈয়দ নাসির উদ্দীনকে সেনাপতির দায়িত্ব দিয়ে অভিযানে পাঠালেন।

দিল্লীতে নিজামউদ্দিন (রহঃ) এর দরগাহ

এদিকে বুরহান উদ্দীন দিল্লীতে নিজামউদ্দিন (রহঃ) এর দরবারে উপস্থিত হয়েছেন। একইসময় দিল্লীতে পৌছেছেন শাহজালাল (রহঃ)। নিজামউদ্দিন (রহঃ) এর মাধ্যমে বুরহান উদ্দিন জানতে পারলে শাহজালাল (রঃ) এর জ্ঞান ও ইবাদতের গভীরতা ও আধ্যাত্বিক শক্তির কথা। বুরহান উদ্দীন নিজের কাহিনী তাঁর নিকট বর্ণনা করেন। শাহজালাল (রহঃ) সিলেটে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন। নিজামউদ্দীন (রহঃ) একজোড়া কবুতর ভালোবাসার নিদর্শন স্বরুপ উপহার দেন। কবুতর জোড়া তিনি পোষা পাখির মত পুষতে লাগলেন। পরবর্তীতে জালালি কবুতর হিসেবে প্রসিদ্দ এ কবুতর সিলেটের বহু গৃহস্থেরর বাড়ীতে দেখা যায়। স্বল্পদিনেই এ কবুতর সংখ্যায় বহু হয়ে যায়। এদের খাওয়া হয় না। এখনো সিলেটে শাহজালাল (রহঃ) এর মাজারে অসংখ্য জালালি কবুতর রয়েছে।

সিলেটে শাহজালালের (রহঃ) মাজারে জালালি কবুতর

ইয়েমেন থেকে ১২ জন সঙ্গীসহ রওনা করলেও পথে পথে তার আধ্যাত্নিকতায় মুগ্ধ হয়ে অনেকেই শিষ্যত্ব গ্রহণ করে তাঁর সঙ্গী হয়েছেন। সংখ্যাটা তখন ২৪০ জন। এই ২৪০ জন অনুসারী নিয়ে তিনি সিলেট এ আসার চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলেন।

আলাউদ্দিন খিলজির প্রেরিত সেনাপতি সৈয়দ নাসিরউদ্দিন এর সাথে দেখা হল শাহজালাল (রহঃ) এর। শাহজালাল (রহঃ) সম্পর্কে জেনে ও দেখে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন নাসিরউদ্দিন। সৈয়দ নাসির উদ্দীনের অধীনের এক হাজার অশ্বারোহী ও তিন হাজার পদাতিক সৈন্যসহ শাহজালাল (রহঃ) নিজ সঙ্গীদের নিয়ে সোনারগাঁ এর উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।

সোনারগাঁ এসে সিকান্দর গাজীর সাথে সাক্ষাৎ করলেন। সিকান্দার গাজী সিলেট ও রাজা গোবিন্দ সম্পর্কে অবহিত করলেন তাঁদেরকে। সকলে মিলে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। শাহজালাল (রহঃ) এর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সিকান্দার গাজী নিজেও শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন। এভাবে পথে পথে অনুসারীর সংখ্যা বাড়তে বাড়তে সিলেটে পৌছানোর আগ পর্যন্ত ৩৬০ জনে পৌছালো।

মুসলিম বাহিনীর অভিযানে অগ্রসর হওয়ার খবর পেয়ে রাজা গোবিন্দ ব্রক্ষ্মপুত্র নদীতে সকল প্রকার নৌকা চলাচল বন্ধ করে দিলেন। তবুও শাহজালাল (রহঃ) তার অনুসারী ও অনুগত বাহিনীকে নিয়ে নদী পার হয়ে অগ্রসর হলেন। কিভাবে নদী পার হলেন সেটা স্পষ্ট জানা যায় না। নিজেরা নৌকা নিয়ে এসেছিলেন কিনা নিশ্চিত নয়। তবে প্রচলিত আছে এবং পরে শাহজালাল (রহঃ) এর ভক্তদের মতে তাঁরা সবাই জায়নামাজে চড়ে নদী পাড় হয়েছিলেন।

শাহজালাল (রহঃ) তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদী পার হয়ে রাজা গোবিন্দের গৌড় রাজ্যের দক্ষিণ সীমা নবীগঞ্জের দিনারপুর পরগণায় উপস্থিত হলেন। গোবিন্দের সৈন্যরা তীর দিয়ে আক্রমণ করলেও কোনরকম ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই শাহজালাল (রহঃ) সামনে অগ্রসর হতে সক্ষম হন। খবর পেয়ে গোবিন্দ এবার সুরমা নদীতেও নৌকা চলাচল বন্ধ করে দেয়, সেখানকার সকল নৌকায় আগুন দিয়ে ধ্বংস করে দেয়। খরস্রোতা সুরমা নদী পার হতে সক্ষম হবে না বলেই ধারনা ছিল গোবিন্দের। আর অস্ত্র হিসেবে তো তার যাদুবিদ্যা আছেই।

শাহ জালাল (রহঃ) পূর্বের মতো জায়নামাজের সাহায্যে বরাক নদী পার হন। এ বিষয়ে প্রাচীন গ্রন্থ তোয়ারিখে জালালীতে উল্লেখ আছেঃ

চৌকি নামে ছিল যেই পরগণা দিনারপুর
ছিলটের হর্দ্দ ছিল সাবেক মসুর
সেখানে আসিয়া তিনি পৌছিলা যখন
খবর পাইলা রাজা গৌবিন্দ তখন ।
এপারে হজরত তার লস্কর সহিতে
আসিয়া পৌছিলা এক নদীর পারেতে
বরাক নামে নদী ছিল যে মসুর
যাহার নিকট গ্রাম নাম বাহাদুরপুর।
যখন পৌছিলা তিনি নদীর কেনার
নৌকা বিনা সে নদীও হইলেন পার।

[উত্তর-পূর্ব ভারতের বরাক নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করার সময় সুরমা ও কুশিয়ারা নামে দুই নদীতে বিভক্ত হয়ে যায়]

গোবিন্দের যাদুমন্ত্রও বিফলে যেতে থাকলো। শাহজালাল (রহঃ) এর বাহিনীর উপর গোবিন্দের যাদুমন্ত্র ব্যর্থ হতে থাকলো। ফলে সবরকম কৌশল যখন বিফল হয়ে গেল তখন শেষ চেষ্টা হিসেবে রাজা গোবিন্দ এক বিশালাকার লৌহধনুক যাদুমন্ত্র করে দিয়ে শাহজালালের (রহঃ) কাছে পাঠায়; এবং শর্ত দেয় কেউ যদি একা উক্ত ধনুকের সাহায্যে তীর মারতে পারে তাহলে গোবিন্দ রাজ্য ছেড়ে চলে যাবে।

শাহজালাল (রহঃ) তাঁর দলের লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন, যে ব্যক্তি কখনও ফজরের নামাজ কাজা করেনি বা বাদ দেয়নি একমাত্র সেই পারবে এই বিশাল লৌহ ধনুক দিয়ে একা তীর মারতে। পাওয়া গেল সৈয়দ নাসির উদ্দীনকে। নাসির উদ্দিন সফল হলেন।

রাজা গোবিন্দ গোপনে রাজ্য ছেড়ে চলে গেল। ১৩০৩ সালে প্রায় বিনাযুদ্ধে সিলেট জয় করলেন হযরত শাহজালাল। কিছুক্ষণ পর সিলেটে প্রথমবারের মত ধ্বনিত হল আযানের সুর।

তিনি তার শিষ্য সিকান্দার শাহকে রাজ্য পরিচালনা ও শাসনভার এর দায়িত্ব দিয়ে নিজে ধর্মের খেদমতে আত্ন নিয়োগ করলেন। সিকান্দার শাহ প্রথমেই জায়গার নাম ‘শ্রীহট্ট’ থেকে ‘ জালালাবাদ ‘ রাখলেন। জালালাবাদে মাদ্রাসা, মক্তব, প্রজাদের যাতায়াতের রাস্তাঘাট, বিশ্রামাগার ও বিশুদ্ধ পানির জন্য নলকূপ স্থাপন করা হলো।

হযরত শাহ জালাল (রহঃ) যখন ইসলাম প্রচারের জন্য যাত্রা শুরু করেন তখন তার সহচর ছিল মাত্র বারোজন। সিলেটে প্রবেশের সময় যে সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৬০ জনে। বাংলাদেশে ইসলাম প্রসারে এই ৩৬০ জনের অবদান অনস্বীকার্য।

শাহজালাল (রহঃ) এর আধ্যাত্নিকতা, কারামত, উদারতায় মুগ্ধ হয়ে এ অঞ্চলের লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ শুরু করলো। প্রায় সারাবছরই তিনি রোজা থাকতেন। আহার করতে খুবই সামান্য। বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা সফরে বের হতেন ধর্ম প্রচারে।

সারাজীবন কঠোর পরিশ্রম ও অবিশ্রান্ত সাধনার ফলে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে পড়লেন। হঠাৎ স্বাস্থের অবনতির ফলে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তার প্রতি অর্পিত আল্লাহর দায়িত্বের হয়ত পরিসমাপ্তি ঘটেছে। তিনি তাঁর সকল শিষ্যগণকে ডেকে পাঠালেন। সকলকে ইসলামের সুমহান আদর্শের প্রতি অবিচল থাকতে ও প্রচার করার পুনঃনির্দেশ দিয়ে সৈয়দ নাসির উদ্দিনের উপর সকল খরিফাগণের তদারকের দায়িত্ব অর্পণ করে যান।

৭৪০ হিজরি সনের (১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দ) জিলহজ্জ মাসের ২০ তারিখ, শুক্রবার। হযরত শাহ জালাল (রহঃ) এর শরীর খুবই খারাপ। পূর্বদিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার তিনি সারাদিন আগত খলিফা, মুরীদ ও ভক্তবৃন্দসহ সাধারন দর্শককে শেষবারের মত দেখা দিলেন। নিজ গৃহে প্রবেশের পূর্বে তার খাদেমকে বললেন কেউ যাতে তার গৃহে প্রবেশ না করে। তিনি রাতের প্রথোমার্ধে জিকির করলেন হঠাৎ তার আওয়াজ ক্ষীণ হয়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই পূর্বের আকাশে আলোর রেখা ছড়িয়ে পড়ল, মসজিদের মিনার হতে আজানের ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল জনপদ। কিন্তু এ কি! এ কি ব্যতিক্রম!! হযরত শাহ জালাল (রহঃ) নিদ্রা হতে উঠছেন না। খাদেম ধীরে ধীরে দরজা ফাঁক করে দেখলেন হুজুর বসা নেই, চীৎ ভাবে শায়িত।

ইহকালের জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেলেন হযরত শাহজালাল (রহঃ)।

 

ভাল লাগলে শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

     এই বিষয়ের আরো সংবাদ