আজ বুধবার, ২৮শে অক্টোবর, ২০২০ ইং, ১২ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

হজরত খাদিজা (রা.) এর জীবন ও আদর্শ

হজরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সম্মানিতা স্ত্রীগণ এই উম্মতের মা। এই উম্মতের ওপর তাদের ত্যাগ তিতিক্ষা কোরবান ও অবদান অনস্বীকার্য।

নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনে ১১ জন স্ত্রী গ্রহণ করেছেন। তাঁর এই ১১ জন স্ত্রী গ্রহণের পেছনে দুনিয়াবি ও জৈবিক কোনো তাড়না ছিল না, ছিল এই উম্মতের খেদমতের সুমহান ধারা। সরল কথায় অল্পভাষায় যদি যুক্তি উপস্থাপন করতে চাই, তাহলে বলবো- তাঁর ১১ জন স্ত্রীর দশই ছিল বিধবা, স্বামীহারা।

তিনি এমন কোনো ছন্নছাড়া মানুষ ছিলেন না যে তাঁর কাছে সমাজের লোকেরা তাদের মেয়ে বিবাহ দিতে রাজি ছিলো না, তাই বিধবা স্বামীহারা মহিলাদের বিবাহ করেছেন। যদি তিনি বলতেন তাহলে সবাই তাদের ঘরের সুন্দরী কুমারী রূপসী লালনাকে এনে দিতে একটুও কুণ্ঠাবোধ করতো না।

তিনি যখন প্রথম বিবাহ করেন তখন তার বয়স হয়েছিল ২৫ বছর। যৌবন শক্তিতে তখন শক্তিমান। তখন তার প্রয়োজন ছিল একজন নবাগত যৌবনা নারী। কিন্তু তিনি গ্রহণ করেছেন একজন চল্লিশ বছরের মহিলাকে। যিনি তার জীবন ও যৌবন শেষ করে যৌবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিছুদিন পরেই যিনি গ্রহণ করবেন যৌবনহীনতা। নবীজি (সা.) এর আগে আরো দুজন স্বামীর সংসার করে এসেছেন। আগের ঘরের সন্তানও ছিলবেশ।

সুস্থ শরীর নিয়ে যৌবনের শক্তিতে তাগড়া একজন যুবকের জন্য কী সাজে একজন চল্লিশ বছরের বৃদ্ধাকে বিয়ে করা? হজরত খাদিজা রাযিআল্লাহু আনহা এর জীবদ্দশায় তিনি দ্বিতীয় কোনো স্ত্রী গ্রহণ করেননি। অথচ প্রয়োজন ছিল প্রচুর। সীরাত গ্রন্থ তারিখুল ইসলামের প্রথম খন্ডে উল্লেখ আছে- ‘ওই সময় বিবাহ করা রাসূলের (সা.) প্রয়োজন ছিল, কারণ তখন ছিল রাসূলুল্লাহ এর যৌবনের পূর্ণসময়। তখন ঘরে পঞ্চাশোর্ধ্ব বৃদ্ধা মহিলা’।

তিনি যখন হজরত খাদিজা রাযিআল্লাহু আনহার পরে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে হজরত সাওদা বিনতে জামআ রাযিআল্লাহু আনহাকে গ্রহণ করেন তখন তার বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই করছে। যেখানে জৈবিক কোনো তাড়না বা তাগাদা ছিল না। হজরত আবুল হাসান আলী নদবী (রহ.) আসসিরাতুন নববিয়্যাহ’ তে লিখেন- নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যার সঙ্গেই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন; তাতে হয়তো কোনো দাওয়াতি সুফল ছিল, কিংবা ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রের বিশেষ কোনো প্রভাব ছিল, কিংবা ব্যাপক কোনো কল্যাণ অর্জন বা বড় কোনো সামাজিক অকল্যাণ দূরীভূতকরণ ইত্যাদি ফায়েদা ও উপকার ছিল।

তাছাড়া বৈবাহিক ও আত্মীয়তার সম্পর্কের আরবীয় সামাজিক ও সাম্প্রদায়িক জীবনধারায় বেশ প্রভাব ছিল। এটাকে তারা এতটা মূল্যায়ন করত, পৃথিবীর অন্য কোনো জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে যার নজির পাওয়া যায় না। আর তাই তো দেখা যায়, এই সকল বৈবাহিক সম্পর্কের ইসলামের দাওয়াত আর তাবলীগের ইতিহাসে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ছিল। তাদের বিবাহের পেছনে উম্মতের মহিলা সংক্রান্ত হাজার হাজার মাসআলার সমাধান ছিল। যদি তিনি একাধিক স্ত্রী গ্রহণ না করতেন, তাহলে এই উম্মত বড় বিপাকে পড়তো। সেই বিপাকে যেন পড়তে না হয়; তাই তিনি একাধিক বিবাহ করে সমস্যার সমাধান দিয়েছেন।

আমাদের সেই পূণ্যাত্মা আম্মাজানদের পরিচয় আমাদের জানা প্রয়োজন। আমাদের আম্মাজানদের মধ্যে সর্বাগ্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাকে বিবাহ করেছেন তিনিই হলেন আম্মাজান হজরত খাদিজাতুল কুবরা রাযিআল্লাহু আনহা। হজরত খাদিজা রাযিআল্লাহু আনহা এর বংশ পরিচয় হলো- কোসাই ইবনে আব্দুল উযযা ইবনে আসআ ইবনে খোয়াইলিদ। হজরত খাদিজাতুল কুবরাহ রাযিআল্লাহু আনহা খোয়াইলিদেরই কন্যা। কোসাই পর্যন্ত পৌছে বংশ পরম্পরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশের সঙ্গে মিশে গেছে।

হজরত খাদিজাতুল কুবরাহ একজন পূণ্যবতী মহিলা ছিলেন। আরব সমাজে তাকে ‘তাহেরা’ বলে ডাকা হতো। তার মাতার নাম ছিল ফাতেমা বিনতে জায়েদা। হজরত খাদিজাতুল কুবরাহ এর প্রথম বিয়ে হয়েছিলো তামিম গোত্রের জরারাহ এর পুত্র আবু হালার সঙ্গে। আবু হালা থেকে তার দুজন সন্তান রয়েছে। একজনের নাম হিন্দ ইবনে আবু হালা; তিনি ইসলাম গ্রহণ করে ছিলেন প্রথম দিকেই। তার থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শামায়েলের বর্ণনা পাওয়া যায়। শুধু তাই তার থেকেই শামায়েলের বর্ণনা বেশি। তিনি সুসাহিত্যিক ও ভাষাবিদ ছিলেন। জঙ্গে জামালে হজরত আলী রাযিআল্লাহু আনহুর পক্ষে শাহাদাত বরণ করেন।

অন্যজনের নাম হারেস ইবনে আবু হালা। আবু হালার মৃত্যুর পর আতিক নামের একজনের সঙ্গে। যিনি মাখজুমি গোত্রের আয়েজের পুত্র। এই আতিক থেকেই তার একজন মেয়ে হয়, তার নামও হিন্দা। আতিকের পরে তিনি হজরত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে বিবাহে আবদ্ধ হোন। রাসূল থেকে তার ঔরসে মোট ছয়জন সন্তান হয়েছে। দুজন কিশোর বয়সেই মারা যান। যে দু’জন মারা গেছেন তারা ছেলে ছিলেন, তাদের নাম ছিল আবু তাহের ও কাসেম। হজরত ইব্রাহিম ব্যতীত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সব সন্তানই তার গর্ভে এসেছে। চারজন মেয়ে হলো- হজরত ফাতেমা রাযিআল্লাহু আনহা, হজরত যয়নব রাযিআল্লাহু আনহা, হজরত রোকাইয়া রাযিআল্লাহু আনহা, হজরত উম্মে কুলসুম রাযিআল্লাহু আনহা।

হজরত খাদিজাতুল কুবরাহ এর একজন বোন ছিল, নাম ছিল হালা। তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন এবং হজরত খাদিজার পর মৃত্যুবরণ করেছেন। হজরত রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে খুব পছন্দ করতেন। তার খোঁজ খবর রাখতেন। খাদিজার মৃত্যুর পর একবার হজরত হালা রাসূলের সাক্ষাতে এলেন। তিনি ঘরের বাহির থেকে অনুমতি চাইলেন। তার গলার কণ্ঠস্বর ছিলো অবিকল খাদিজার মতো। তার কণ্ঠ শুনে রাসূল (সা.) এর খাদিজার কথা মনে পড়ে গেল। সেখানে হজরত আশেয়া রাযিআল্লাহু আনহা উপস্থিত ছিলেন, তার অত্যন্ত হিংসা হলো। তিনি বলে উঠলেন- আপনার কী হয়েছে যে, এক বৃদ্ধা তাও আবার মারা গেছে তার কথা সবসময় মনে পড়ে? খোদা তায়ালা আপনাকে তার থেকে উত্তম স্ত্রী দান করেছেন! এর উত্তরে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- কখনো নয় হে আয়েশা! যখন মানুষ আমাকে মিথ্যাবাদী বলেছিল, তখন খাদিজা আমাকে সত্যবাদি বলে স্বীকৃতি দিয়েছিল, যখন মানুষ কাফের ছিল, তখন খাদিজা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল, যখন আমার কোনো সাহায্যকারী ছিল না, তখন খাদিজা আমার সাহায্যকারী হয়েছে, তাঁর গর্ভেই আমার সন্তান হয়েছে।’ (ইস্তিয়াব : হজরত খাদিজা অধ্যায়)।

স্ত্রীদের মধ্যে তাকেই বেশি ভালোবাসতেন এবং সদাসর্বদা তার কথাই আলোচনা করতেন। তার মৃত্যুর পর বাড়িতে কোনো পশু জবেহ হলে- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদিজার বান্ধবিদের বাড়ি খুঁজে খুঁজে পাঠাতেন। মুসলিমের এক বর্ণনায় আছে হজরত আয়েশা রাযিআল্লাহু আনহা বলেন- আমি হজরত খাদিজাকে কখনো দেখিনি, তারপরও তার প্রতি আমার যে হিংসা হয়, আর অন্য কারো প্রতি এতো হিংসা হয় না! কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বক্ষণ তার কথাই আলোচনা করতেন। একবার আমি হজরতকে খাদিজা প্রসঙ্গে মনে কষ্ট দিলাম। তিনি খুব কষ্ট পেলেন। অতপর তিনি আমাকে বললেন- ‘আল্লাহ পাকই আমার অন্তরে তার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে দিয়েছেন’।

নবুওয়তের সপ্তম বছর মুহাররম মাসে কুরাইশরা মুসলমানদের বয়কট করে। তারা ‘শিয়াবে আবু তালিবে’ আশ্রয় গ্রহণ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে খাদিজাও সেখানে অন্তরীণ হন। প্রায় তিনটি বছর বনী হাশিম দারুণ দুর্ভিক্ষের মাঝে অতিবাহিত করে। গাছের পাতা ছাড়া জীবনধারণের আর কোনো ব্যবস্থা তাদের ছিল না। স্বামীর সঙ্গে খাদিজাও সে কষ্ট হাসিমুখে সহ্য করেন। এমন দুর্দিনে হজরত খাদিজা নিজের প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন উপায়ে কিছু খাদ্য খাবারের ব্যবস্থা মাঝে মধ্যে করতেন।

হজরত খাদিজার মৃত্যু:

খাদিজার পিতার মৃত্যু কখন হয়েছিল সে সম্পর্কে মতভেদ আছে। কেউ বলেছেন, ফিজার যুদ্ধে মারা যান। ইমাম সুহাইলির মতে ফিজার যুদ্ধের আগেই মারা যান। (হায়াতুস সাহাবা-২/৬৫২)

আরেক বর্ণনায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে পঁচিশ বছর দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করার পর নবুয়্যতের দশম বছরে দশই রমজান পয়ষট্টি বছর বয়সে হজরত খাদিজা মক্কায় ইন্তেকাল করেন। জানাজা পড়ার বিধান তখনো চালু হয়নি। তাই বিনা জানাজায় তাকে মক্কার কবরস্থান জান্নাতুল মুয়াল্লায় দাফন করা হয়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই তার লাশ কবরে নামান।

আম্মাজান হজরত খাদিজার ফজিলত ও মর্যাদা বর্ণনা করে শেষ করা যাবে না। আমরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করি, আরবের সেই ঘোর অন্ধকার দিনে এক মহিলা নিঃসংকোচে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়তে বিশ্বাস স্থাপন করেছেন। তার মনে বিন্দুমাত্র সংশয় ও সন্দেহ নেই। সেই ওহী নাজিলের প্রথম দিনটি, ওয়ারাকার নিকট গমন এবং রাসূলের নবী হওয়া সম্পর্কে তার দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা সব কিছুই গভীরভাবে ভেবে দেখার বিষয়।

রাসূল (সা.) এর নবুয়ত লাভের পর্ব থেকে খাদিজা যে দৃঢ় প্রত্যয়ী ছিলেন, তিনি নবী হবেন। তাই হজরত জিবরাঈল আলাইহিস সালামের আগমনের পর ক্ষণিকের জন্যও তার মনে কোনো রকম ইততস্ত ভাব দেখা যায়নি। তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলে দিলেন, এই তো সেই লোক যা হজরত মুসাসহ অন্যান্য নবীদের নিকট আসছিল। আম্মাজান হজরত খাদিজা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যেভাবে জানতেন রাসূল (সা.)-ও তাকে সেভাবে জানতেন। হজরত খাদিজার ফজিলত সম্পর্কে বহু হাদীস বর্ণিত হয়েছে।

সহীহ বুখারী ও মুসলিমের সূত্রে উল্লেখ করছি- পৃথিবীর শ্রেষ্ট মহিলা হলো মারইম বিনতে ইমরান, খাদিজা বিনতে খোয়াইলিদ। হজরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম বসে আছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে; এমন সময় খাদিজা রাযিআল্লাহু আনহু আসলেন। জিবরাঈল আলাইহিস সালাম রাসূল (সা.)-কে বললেন, ‘তাকে স্বর্ণ হিরামতিপান্নার তৈরি একটি বেহেশতি মহলের শুভসংবাদ দিলাম।’ এ ছিলেন হজরত খাদিজা (রা.)। যিনি গোটা উম্মতের জন্য আদর্শ হয়ে থাকবেন কেয়ামত পর্যন্ত।

ভাল লাগলে শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

     এই বিষয়ের আরো সংবাদ

ফেসবুকে দৈনিক তথ্য