আজ শনিবার, ২৮শে নভেম্বর, ২০২০ ইং, ১৩ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় সিক্ত হলেন বর্ষিয়ান নেতা,ভাষা সৈনিক ও সাবেক এমপি এম নুরুল ইসলাম দাদুভাই

তথ্য প্রতিবেদকঃ দীর্ঘ তিন বছর অসুস্থ্য থাকার পর নিভৃতে নীরবে চলে গেলেন বর্ষিয়ান নেতা, ভাষা সৈনিক ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ, খুলনা নগর বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য এম নুরুল ইসলাম দাদু (ইন্নালিল্লাহি…রাজিউন)। তিনি ৮৬ বছর জীবিত ছিলেন। গতকাল বুধবার আনুমানিক সকাল ৮টা ১০ মিনিটে সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পরার পর বাবুখান রোড ও বিএনপি অফিস এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
দলীয় সূত্র জানায়, বাবুখান রোডস্থ বাসভবন থেকে তার লাশ দুপুর ১২টায় স্থানীয় বিএনপি কার্যালয়ে আনা হয়। শোক সন্তপ্ত পরিবারবর্গের প্রতি শোক জানাতে মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক, সাবেক সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান মিজান, নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এমডিএ বাবুল রানা, সাবেক সংসদ সদস্য স ম বাবর আলী, বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সমন্বয় সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিব শেখ আশরাফুজ্জামান মরহুমের বাসভবনে যান। বিএনপি কার্যালয় প্রাঙ্গণে জেলা ও নগর বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল, মহিলা দল, কৃষক দল, স্বেচ্ছাসেবক দল, খালিশপুর থানা বিএনপি, ডুমুরিয়া উপজেলা বিএনপি মরহুমের মরদেহ’র ওপর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও নগর সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু, জেলা সভাপতি শফিকুল আলম মনা, নগর সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মেয়র মোঃ মনিরুজ্জামান মনি, নগর শাখার সহ সভাপতি সাহারুজ্জামান মোর্তুজা, জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি আব্দুল্লাহ হোসেন বাচ্চু, নগর নেতা মোঃ তরিকুল ইসলাম, শেখ মোশাররফ হোসেন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। বাদ আসর সার্কিট হাউজ ময়দানে তার নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়।
জানাজার নামাজ শেষে টুটপাড়া কবরস্থানে পিতার কবরের পাশে দাফন করা হয় ভাষা সৈনিক এম নুরুল ইসলাম দাদু ভাইকে। জানাযায় উপস্থিত ছিলেন খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও নগর আ’লীগের সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেক, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আ’লীগের সভাপতি শেখ হারুনুর রশিদ, সাবেক সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান, নগর আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক এমডিএ বাবুল রানা, এমরান হোসেন। বিএনপি নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জেলা বিএনপির সভাপতি এড. শফিকুল আলম মনা, নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনি, সিনিয়র সহ-সভাপতি সাহারুজ্জামান মোর্ত্তজা, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমীর এজাজ খান, বিএনপি নেতা সৈয়দ সাবেরুল ইসলাম সাবু, মীর কায়সেদ আলী, শেখ মোশাররফ হোসেন, জাফরউল্ল াহ খান সাচ্চু, এড. এসআর ফারুক, সিরাজুল ইসলাম, স ম আব্দুর রহমান, ইকবাল হোসেন, শেখ জাহিদুল ইসলাম, অধ্যক্ষ তারিকুল ইসলাম, মনিরুজ্জামান মন্টু, শেখ আব্দুর রশিদ, জুলফিকার আলী জুলু, আরিফুজ্জামান অপু, মোল্ল া খায়রুল ইসলাম, সিরাজুল হক নান্নু, মাহবুব কায়সার, নজরুল ইসলাম বাবু, আসাদুজ্জামান মুরাদ, সাইফুর রহমান মন্টু, আবু হোসেন বাবু, কামরুজ্জামান টুকু, আশরাফুল আলম নান্নু, শহিদুল আলম, শেখ মোশারফ হোসেনসহ থানা, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন বিএনপি ও অঙ্গসহযোগি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং সাংবাদিক, প্রকৌশলী, ব্যবসায়ী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। জামায়াত নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারী মিয়া গোলাম পরোয়ার, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মাওলানা এমরান হোসেন, মাওলানা শফিকুল আলম, মাওলানা মাহফুজুর রহমান, এড. শাহ আলম। জাতীয় পার্টির নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এড. লতিফুর রহমান লাবু, সিরাজ উদ্দিন সেন্টু, আবুল হোসেন, মুজিবর রহমান, ইসলামী আন্দোলনের নগর সেক্রেটারী শেখ মোঃ নাসির উদ্দিন, মাওলানা ভাষানী পরিষদের সভাপতি শেখ আ: হালিম, কবি নজরুল গবেষণা পরিষদের সভাপতি সৈয়দ আলী হাকিম, মরহুম এম নুরুল ইসলাম দাদু ভাইয়ের ছেলে আরিফুল ইসলাম ও মনিরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। সন্ধ্যায় টুটপাড়া কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়।এছাড়া সমবেদনা জানাতে আসেন জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক এড. সুজিত অধিকারী।
সংক্ষিপ্ত জীবনী : রাজনৈতিক অঙ্গনে দাদু ভাই বলে পরিচিত। ১৯৩৪ সালের ২ জুলাই তিনি খুলনা শহরের বাবু খান রোডে জন্মগ্রহণ করেন। মরহুম ডাঃ খাদেম আহমেদ তার পিতা ও আছিয়া খাতুন তার মা। তার পৈত্রিক নিবাস মাগুরা জেলার শালিখা থানার সোলাপুর গ্রাম। ১৯৪৭ সালে কলকাতা মেট্রোপলিটন হাইস্কুল থেকে মেট্রিক এবং ১৯৪৯ সালে বিএল একাডেমি থেকে আইএ পাশ করেন। ছাত্র জীবনে তিনি নিখিল বাংলা মুসলিম ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৭ সালে খুলনায় ন্যাপের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও ১৯৬২ সালে খুলনা পৌরসভার জাহানাবাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৭২ সালে ন্যাপের খুলনা শহর শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬ সালের ১৬ মে ফারাক্কা অভিমুখে মিছিলে অংশ নেন। দীর্ঘপথ হেটে চাপাইনবাবগঞ্জ কনসাটে উপস্থিত হন। ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন জাগদলে যোগ দেন। ১৯৭৯ সালে খুলনা মহানগরী বিএনপি’র সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দীর্ঘ সময় এই দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৭৯ সালে বিএনপির মনোনয়নে খুলনা সদর আসন থেকে সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত স্বৈরশাসন বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ৭ দলীয় জোটের পক্ষে নেতৃত্ব দেন। তিনি দীর্ঘসময় ৭ দলীয় জোট, খুলনার আহবায়ক ছিলেন। ১৯৯১ সালে খুলনা-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য প্রার্থী ছিলেন। ২০০১ সালে চারদলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে খুলনা-৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বিএনপি’র চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি নাট্য নিকেতন, হার্ট ফাউন্ডেশন, শিল্পকলা একাডেমি, রূপসার আলাইপুর ডিগ্রী কলেজ, রূপসা কলেজ, উমেশচন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরি, সেন্ট জোসেফস্ হাই স্কুলের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, মালয়েশিয়া, সিংগাপুর সফর করেছেন। লায়লা ইসলাম তার স্ত্রী। পুত্র আরিফুল ইসলাম লুনিক প্রকৌশলী, তরিকুল ইসলাম লুতাম, মনিরুল ইসলাম মনি, কন্যা সাহানা পারভিন, সাবেরা ইসলাম ও তাহেরা ইসলাম সবাই প্রতিষ্ঠিত। মৃত্যু ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর সকাল আটটা।
ভাষা আন্দোলনের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে ৬৪ বছর আগে যারা খুলনায় মিছিল সমাবেশ-এর আয়োজন করতেন তাদের একজন এম নুরুল ইসলাম। তিনি আজও মিছিল-সমাবেশ নিয়ে আছেন খুলনার রাজপথে। সে দিন তিনি ছিলেন টগবগে যুবক, আজ জীবন সায়াহ্নে।
ঢাকার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে খুলনা ভাষা আন্দোলন গড়ে তুলতে সে দিন হাতে গোনা কয়েকজন যুবক শ্রম ও মেধা নিয়োগ করেন। ঢাকার অনুরূপ খুলনায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রæয়ারি হরতাল পালিত হয়। হরতাল সফল করতে যারা এগিয়ে আসেন তাদের মধ্যে তিনি একজন। ২১ ফেব্রæয়ারি ঢাকার ছাত্রদের মিছিলে গুলিবর্ষণ ও ছাত্র নিহত হওয়ার প্রতিবাদে খুলনার যুব সমাজ ২৩ ফেব্রæয়ারি মিছিল বের করে। অবাঙালি ও মুসলিম লীগের গুন্ডাবাহিনী মিছিলের ওপর লাঠিসোটা নিয়ে আক্রমণ করে। ছাত্র জনতা সে আক্রমণ প্রতিহত করে। মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুরের সমর্থকরা ভাষা আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্তদের বাড়ি বাড়ি হামলা ও মারপিট করে। ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ায় এম নুরুল ইসলামের নামে মামলা হয়।

ভাল লাগলে শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

     এই বিষয়ের আরো সংবাদ

ফেসবুকে দৈনিক তথ্য