আজ রবিবার, ৯ই আগস্ট, ২০২০ ইং, ২৫শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

শুধু মর্যাদার জন্যই নয়, জীবনের তাগিদে প্রয়োজন নবম গ্রেড (একজন সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারের আবেগ ঘন স্টাটাস)

সকল পর্যায়ে অধিক সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা একজন কর্মকর্তার নাম এটিইও বা এইউইও(সহকারী উপজেলা/থানা শিক্ষা অফিসার)। বিশেষ করে উপজেলার সবচেয়ে বড় জনবল তথা উপজেলা শিক্ষক পরিবারের কাছে অতীব সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্র এই ব্যক্তি(এটিইও)। এই সম্মানীয় ব্যক্তিকে অর্থাৎ সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার মহোদয়কে নিজ দপ্তরের কাজ ছাড়াও ট্যাগ অফিসারের মত কঠিন ও ঝুকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা সহ, সারা বছরে একাধিক পরীক্ষা কেন্দ্রে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন সহ উপজেলা/জেলা সদরের শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ অতি নিষ্ঠার সাথে সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে হয়। উপজেলার প্রথম শ্রেণির(নবম গ্রেডধারী) কর্মকর্তাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমবণ্ঠনে এ সকল কাজ সমাধান করা নিত্য নৈর্মিত্তিক ব্যাপার। অতীব দুঃেখের সাথে বলতে হয়, এই এটিইও মহোদয়ের চাকুরীর শুরুতে বেতন ১৬,০০০ টাকার স্কেলে সর্বসাকুল্যে ২৪৫০০ টাকা। অবশ্য এই বেতনটা অনেক বড় হতো যদি গ্রামের নিজ বাড়িতে থেকে তাদের চাকরিটা করার সুযোগ থাকতো। আর সেটা তো নিয়ম বহির্ভুত।

আমি বর্তমানে একজন সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার। এটা আমার গর্ব। অনেক ত্যাগ, তিতিক্ষা, শ্রম ও কষ্টের বিনিময়ে আমার এ অর্জন। ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর আমার এ পদে যোগদান। সারা দেশে লক্ষ লক্ষ প্রতিযোগীর মধ্যে সর্বশেষ ধাপে ১২৫ জন এ পরীক্ষায় উর্ত্তীর্ণ হয়। যোগদান করে ১১৫ জন। বাকি ১০ জন সহ পরবর্তীতে অনেকে প্রশাসন সহ বিভিন্ন ক্যাডারে চলে যান। সীমিত সংখ্যক পদে টিকে থাকাটা কত বড় চ্যালেঞ্জের তা প্রতিযোগীরাই বুঝতে পারে।

বর্তমানে এ পদে আমার চাকরীর বয়স প্রায় আড়াই বছর। আমার মূল বেতন ১৭,৬৪০ টাকা। সর্বসাকুল্যে ২৬,১৯৬ টাকা। জিপি ফান্ডে ১০০০ টাকা ও কর্মচারী কল্যান ও যৌথবীমা ফান্ডে ২৫০ টাকা কাটার পরে থাকে ২৪৯৪৬ টাকা। বড় ভাইয়েরা জিপি ফান্ডে আরও টাকা কাটার কথা বলে। কিন্তু সাহসে পারি না। কারণ এই সীমিত ্্বতেন নিয়ে ফ্যামিলিসহ (দুই পুত্র ও স্ত্রী সহ আমরা চার জন) একটি উপজেলার বাসা বাড়িতে থাকা কত যে অর্থ কষ্টের তা আমি প্রতিনিয়ত মর্মে মর্মে উপলব্ধি করি। অবশ্য বাড়িতে থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকতায় আট বছরেও এমন অভাব অনুভব করিনি।

একজন সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার মহোদয়ের পরিবারের মাসিক খরচের বিবরণ তুলে ধরা হলোঃ
আমি উপজেলা সদরে একটি পাকা বাড়িতে বাসা ভাড়া থাকি। আমার মাসে বাসা ভাড়া দিতে হয় ৫০০০ টাকা, পানি বিল ২০০ টাকা, খাবার পানি ক্রয় বাবদ মাসে প্রায় ৭০০ টাকা (এখানে পানি কিনে খেতে হয়), কারেন্ট বিল কমপক্ষে ১৫০০ টাকা, ডিশ বিল ৩০০ টাকা, বুয়া বিল ৩০০০ টাকা, বড় ছেলের জন্য বাসার টিউটর ও অন্যান্য খরচ বাবদ ৪০০০ টাকা। গানের শিক্ষককে ১০০০ টাকা, ছোট ছেলের সারা মাসের দুধ কেনা বাবদ প্রায় ৪০০০ টাকা। এবার দেখুন বেতনের আর কত বাকি রইল,(২৪৯৪৬-৫০০০-২০০-৭০০-১৫০০-৩০০-৩০০০-৪০০০-১০০০-৪০০০)= ৫২৪৬ টাকা। এবার আপনারাই বলুন, এই সীমিত টাকায় মাসব্যাপী আমার হাত খরচ এবং চার সদস্য বিশিষ্ট্য পরিবারের সারাটি মাসের বাজার যেমন- চাল, ডাল, মাছ, মাংস, সবজি, মসলা ইত্যাদির খরচ চালিয়ে যাওয়া কি সম্ভব?
অতীব দুঃখের সাথে বলতে হয়, মাছ বাজারে যেয়ে আমাকে অতি গোপনে মাছ কিনতে হয়। কারণ আমার জন্য বরাদ্দ থাকে বাজারের সব থেকে কম দামি মাছটা(যেমন-তেলাপিয়া, পাঙ্গাশ ইত্যাদি)। দামী মাছ গুলোর শুধু দাম শোনা ও তাকানোই সার হয়ে থাকে। স্ত্রী সন্তানের আবদারও আর মেটানো হয় না। দামী বা বড় মাছ, মাংস খাওয়ার স্বপ্ন তাদের স্বপ্নই থেকে যায়। নিভৃতে চোখের পানি ফেলা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। এভাবেই চলে একজন অতি সম্মানী, শ্রদ্ধেয়, দামী অফিসারের জীবন। মাঝে মাঝে খুব লিখতে ইচ্ছা করে। ভাবি মিডিয়ার মাধ্যমে জানুক সরকার। জানুক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার রূপকার, ১৬ কোটি মানুষের প্রাণের নেত্রী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। কারণ এ পদটি আজ তার মর্যাদা ও আভিজাত্য হারাতে বসেছে। যা হতে পারে উপজেলা শিক্ষা পরিবারের কাছে হুমকির স্বরূপ। শুনছি এবং দেখছি তো চাওয়ার পূর্বেই তিনি দু-হাত ভরিয়ে দেন। তাঁর দুয়ার অফুরন্ত সম্পদের ভাণ্ডার। দেশ আজ উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে। অভাব বলতে তো কোথাও দেখি না। কোভিড-১৯ এ ট্যাগ অফিসারের মত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন কালে আমি সেটা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছি। আর তিনি আমাদের জন্য এটুকু করতে পারবেন না? তা কখনো হতেই পারে না। কিন্তু কী বলব- ‘চাচা মরে মানের দায়’। বাঙালি মেয়েদের মত- ‘বুক ফাটে তো মুখ ফাটে না’। আমাদের শুধু- ‘বাইরেই ফিটফাট কিন্তু ভিতরে সদরঘাট’। কে তার খবর রাখে।

মাছ বাজারে যেয়ে যে কোনো পরিচিত মানুষ বিশেষ করে শিক্ষকদের থেকে নিজেকে বেশি আড়াল করে রাখতে হয়। কারণ তারা অধিকাংশই বাজারে এসে বড় ও দামী মাছ গুলো কিনে। আমার এ সস্তা মাছ কেনা দেখলে জাত যাবে। জুনিয়র অফিসার হওয়ায় তাদের অধিকাংশের বেতন আমার থেকে বেশি কিন্তু তাদের তো বেতনেই হাত দেওয়া লাগে না কারণ তাদের তো বাড়িতে থেকে চাকরী। পাশাপাশি ছোট খাটো ব্যবসা। টুকটাক মাছ আর মসলা ছাড়া কিছুই কেনা লাগে না। অনেকের তাও কেনা লাগে না। উল্টো তাদের অনেকের বাড়ির মাছ ও সবজি নিয়মিত বিক্রি করা লাগে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক থাকতে যেটা আমিও করেছি।

আমি আট বছর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের চাকরী করেছি। বাড়িতে থেকে চাকরীর পাশাপাশি কৃষিকাজ, সবজি চাষ, মাছ চাষের মত ছোট খাটো ব্যবসাও করেছি। প্রতি মাসে বেতন থেকে বাবার হাতে কিছু টাকা তুলে দিতাম। লোকটার মুখে সে যে কি আনন্দ! সত্যি দেখে গর্বে আমার বুক ভরে যেত। অনেক মাসে সারা মাসের বাজার ঘাট করা সহ বাবার হাতে নির্ধারিত টাকা দিতে চাকরীর বেতনেও হাত দেওয়া লাগতো না। কিন্তু অতি দুঃখের সাথে বলতে হয়- এখন বাবাকে মাসে মাসে টাকা দেওয়া তো দূরে থাক্ কোনো কোনো মাসে নিজের সংসার চালাতে তার কাছে হাত পাততে হয়। বাবাকে গ্রামের সকলে বলে আপনার ছোট ছেলে তো এখন অনেক বড় চাকরী করে। আপনার আর পায় কে। আপনি বড়ই ভাগ্যবান। প্রতিত্তুরে বাবা তেমন কিছুই বলে না। প্রায় এক বছর পর পরিবার নিয়ে ছুটিতে বাড়ি গেছি। ঐ দিন রাত ১০ টার দিকে আমার বাবা নিরবে আমার ঘরে ঢুকলেন এবং আমাকে প্রশ্ন করলেন- তুমি কত টাকা বেতন পাও? (আমার স্ত্রী আমার পাশেই ছিল)। আমি কিছুটা বিস্মিত হলাম এবং প্রতিত্তুরে বললাম, কেন বাবা? বাবা বললেন- আমি একটু শুনি। আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, পঁচিশ হাজার টাকার মত পাই। বাবা মুখটিকে বিকৃতি করে বলল মাত্র পঁচিশ হাজার টাকা? বাবার এমন বিকৃতি মুখ মনে হয় না কোনো দিন দেখেছি। একটি কথা বলতে ভুলে গেছি। আমার বড় ভাই একজন এমপিও ভুক্ত হাইস্কুলের ইংলিস শিক্ষক। বাড়িতে থেকে চাকরি করে। বেতনে তো হাত দেওয়াই লাগে না। বরং প্রাইভেট পড়িয়ে ও মাছ চাষের ব্যবসা হতে পুরা সংসার খরচ চালানোর পরেও আট/দশ হাজার টাকা ডানে রাখতে তার কোনো সমস্যাই হয় না। আমি এখন আর আগের মত সংসারে বা যে কোনো আর্থিক বিষয়ে সাপোর্ট দিতে পারি না। তাই সম্পর্কটাও টিকিয়ে রাখা প্রায় দায়। আপনজন তো দূরে থাক, আত্মীয় স্বজনও কেমন কেমন কথা বলে। বড় চাকরী করি অথচ সংসারে টাকা দেই না, বাবা মায়ের দিকে তেমন খেয়াল করি না ইত্যাদি। তখন ভাবি এই চাকরীতে যাওয়াটাই কি আমার পাপ! শিক্ষকতায় তো ভালই ছিলাম।

ফেজবুক খুলতেই প্রতিদিন দেখি “এটিইও গ্রুপ” আইডিতে নবম গ্রেডের প্রত্যাশায় হাজার হাজার কমেন্ট। কমেন্টে রয়েছে কত আকুতি মিনতি, অনুরোধ, প্রতিরোধ, কান্নাকাটি চেল্লাচেল্লি আর হতাশার ঝড়। গ্রুপের এই আকুতি মিনতি সমালোচনার ঝড় যে, এটিইও গ্রুপেই থেকে যায়। তাই কলম ধরেছি। বার বার আশা পেয়েও নিরাশার অন্ধকারে ডুবে এই পরিবারটা যে আজ পুরোপুরি হতাশাগ্রস্থ। দেশের আলোর পথের দিশারী কর্মকর্তাদের এমন পরিস্থিতি কি সরকার কোনদিন বুঝবে না! এটিইও দের সম্মান ও আত্মমর্যাদা নিয়ে একটু কী ভাবার সময় নেই তাঁদের হাতে।

পরিশেষে শুধু একটাই কথা বলার আছে। সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসারের শুধু মর্যাদার জন্য নয়, জীবনের তাগিদে প্রয়োজন নবম গ্রেড। প্রয়োজন পদটিকে ক্যাডার পদে উন্নিত করা। শিক্ষক সমাজ তথা উপজেলার সবচেয়ে বড় জনবলকে কন্ট্রোল করার নিমিত্তে যারা নিয়োজিত তাদের জন্য এটা করা কি খুবই অযৌত্তিক? যে সকল কর্মকর্তা জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধর কোমলমতি শিশুর শিখন শেখানো কাজ দেখভালের দায়িত্বে নিয়োজিত, শিশুকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা, সুনারিক ও সুআচরনিক হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনায় সদা নিবেদিত। যারা ইচ্ছা করলে শিখন শেখানো কাজে শিক্ষকদের ইতিবাচক মনোভাব তৈরিতে সহায়তা করা তথা প্রত্যেকটি বিদ্যালয়কে আদর্শ বিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। পারে একটি সুন্দর পরিকল্পনায় সীমিত সময়ের মধ্যে অজপাড়া গাঁয়ের একটি জরাজীর্ণ ভঙ্গুর বিদ্যালয়কে দেশ সেরা বিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলতে। যদি বলা হয় শিক্ষার মান উন্নয়নে বা জাতিকে এগিয়ে নেওয়ার ভূমিকায় প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ এটি তবে হয়ত ভুল বলা হবে না। তবে তাঁদের পদটিকে নবম গ্রেড করার বহুদিনের দাবিটা অন্যায় কি? এখানে সরকারের বড় আর্থিক বিষয় রয়েছে তাও তো নয়। তবে কেন তাঁদের প্রাণের দাবি নবম গ্রেড বাস্তবায়ন হয় না, সরকারের পক্ষ থেকে বার বার আশ্বাস দেওয়া সত্ত্বেও কেন তা বাস্তবায়ন হয় না? অতি দুঃখের সাথে বলতে হয়, অতীব গুরুত্বপূর্ণ এই পদটির কার্যকলাপ ও পদমর্যাদা নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বা সরকার কে সামান্যতম ভাবতেও দেখি না। এটা যে একজন সহকারী উপজেলা /থানা শিক্ষা অফিসারের শুধুই মর্যাদার লড়াই নয়, নবম গ্রেড যে তাঁদের জীবনের তাগিদে প্রয়োজন।

(লেখকঃ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক)

ভাল লাগলে শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

     এই বিষয়ের আরো সংবাদ

ফেসবুকে দৈনিক তথ্য