আজ শনিবার, ২৩শে নভেম্বর, ২০১৯ ইং, ৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

পাইকগাছার বকুল গাছ প্রেমিক সিদ্দিক এখন তাল গাছ প্রেমিক

বাবুল আক্তার, পাইকগাছা: নাম তার সিদ্দিক মোড়ল (৬০)। কেউ বলে সিদ্দিক পাগল, কেউ বা বলে বকুল প্রেমিক, আবার কেউ বা বলে বকুল ট্রি। হতদরিদ্র সিদ্দিক মোড়ল বাড়ি খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনি ইউনিয়নের দক্ষিণ শ্যামনগর গ্রামে। ৬০ বছর বয়সী সহজ-সরল সিদ্দিক মোড়ল গুছিয়ে কথাও বলতে পারেন না। ছোট একটি কুঁড়েঘর ছাড়া আর কোনো কিছু নেই তাঁর। রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে ঘরটির ছাউনি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে পলিথিন। বাতাসে পলিথিন যেন উড়ে না যায়, তাই চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে কয়েকটি নারকেল ও সুপারিপাতা দিয়ে। এ ঘরেই তিনি থাকেন স্ত্রীসহ দুই সন্তান নিয়ে। বড় ছেলের নাম জাহিদুল গাজী (১১) আর মেয়ের নাম খাদিজা খাতুন (৯)। তারা স্কুলে পড়ে।

এই বকুল গাছ প্রেমিক শুধু পাইকগাছা উপজেলা নয়, ৩৪ বছরের বেশি সময় ধরে আশপাশের বিভিন্ন উপজেলাসহ যশোর ও সাতক্ষীরা জেলার বিভিন্ন শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস ও ক্লাবের সামনে এবং রাস্তার ধারে সিদ্দিক মোড়ল লাগিয়েছেন বকুলগাছ। এ পর্যন্ত ১২ হাজারের বেশি বকুলগাছ লাগিয়েছেন হতদরিদ্র সিদ্দিক মোড়ল।
গাড়িতে চড়তে ভয় পান সিদ্দিক মোড়ল। তাই হেঁটে যত দূর যাওয়া যায়, তত দূর পর্যন্ত তাঁর লাগানো বকুলগাছের বিস্তৃতি। শুধু গাছগুলো লাগিয়েই ক্ষান্ত হন না সিদ্দিক, মাঝে মাঝে গিয়ে সেগুলোর পরিচর্যাও করেন। এলাকায় কোনো বিশেষ অতিথি এলে সিদ্দিক মোড়ল বকুলগাছের চারা নিয়ে ছুটে যান তাঁকে উপহার দেওয়ার জন্য। এসব কারণে এলাকায় তিনি ‘বকুল ট্রি সিদ্দিক ভাই’ নামে পরিচিত।
নিজস্ব কোনো আয়ের উৎস নেই সিদ্দিক মোড়লের। পথের ধারে বা খাল-বিলে জন্ম নেওয়া হেলেঞ্চা, কলমিসহ বনজ শাকসবজি তুলে বিক্রি করেই জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি। কিন্তু সেই মানুষটিই বিলিয়ে বেড়াচ্ছেন বকুলের সুবাস।
সিদ্দিকের ছোট ভাই লুৎফর মোড়ল বলেন, সংসারে কষ্ট থাকলেও কোনো প্রকার লোভ স্পর্শ করতে পারেনি তাঁর ভাইকে। পরিবার থেকে শত বাধার পরও তিনি দমে যাননি। আপনমনে বিনে পয়সায় বকুলগাছ লাগিয়ে চলেছেন।
কেন শুধু বকুলগাছ লাগান—জানতে চাইলে সিদ্দিক মোড়ল বলেন, বকুলগাছের ফুল ও ফল ছেলেমেয়েদের কাছে খুব প্রিয়। পাখিও এর ফল খায়। আর বকুল ফুলের সুগন্ধ যেকোনো মানুষের মনকে ভালো করে দেয়। এ কারণেই বকুলগাছ লাগান তিনি।

বকুল মাঝারি আকারের পাতাবহুল গাছ হলেও এটি ফুলের জন্য বেশি পরিচিত। বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলেই এই গাছ দেখা যায়। ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, চীন, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ায় এ গাছ দেখা যায়। তারকা আকৃতির এবং খুব ছোট বকুল ফুল রাতে ফোটে এবং দিনভর টুপটুপ করে গাছ থেকে মাটিতে ঝরে পড়ে। শুকিয়ে গেলেও অনেক দিন সুবাস থাকে বকুল ফুলের। ডিম্বাকৃতির লাল পাকা ফল কষ-মিষ্ট। পাখপাখালির পাশাপাশি কিশোর-তরুণেরা এ ফল মজা করে খায়। কখনোই গাছের সব পাতা ঝরে পড়ে না বলে এটি অন্যতম ছায়াবৃক্ষ। এর কাঠ অনেক শক্ত, তবে মসৃণ।

সিদ্দিক মোড়ল বলেন, ‘শুধু মনের ইচ্ছা থেকেই বকুলগাছ লাগানো শুরু করি। প্রথমে চারটি গাছ লাগানোর পর মনের জোর বেড়ে যায়। এরপর যত দূর হেঁটে যাওয়া যায় তত দূর পর্যন্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বকুলগাছ লাগিয়েছি।’

শুরুর কথা জানালেন সিদ্দিক গাজী। ১৯৮৫ সালের কোনো একদিন ৪০ টাকা দিয়ে স্থানীয় একটি বাজার থেকে চারটি বকুলগাছের চারা কেনেন তিনি। এলাকার ঝোপঝাড়, পুকুর, খাল-বিল থেকে হেলেঞ্চা শাক সংগ্রহ করে তা বাজারে বিক্রি করে এ গাছগুলো কিনেছিলেন তিনি। এরপর হেঁটে চারাগুলো নিয়ে চলে যান বাজার থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কপিলমুনি কলেজে। সেখানে একটি বকুলের চারা লাগান। তারপর কপিলমুনি আলিয়া মাদ্রাসায় একটি চারা রোপণের পর হেঁটে চলে যান প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের সাতক্ষীরা জেলার তালা সরকারি কলেজে। কলেজের অধ্যক্ষের অনুমতি নিয়ে সেখানে লাগান আরেকটি চারা। এরপর যান প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরের ওই জেলার পাটকেলঘাটা উপজেলার হারুনার রশিদ কলেজে। বাকি চারাটি রোপণ করেন সেখানে।

এই চারটি গাছ লাগানোর পর ১৯৯০ সালে স্থানীয় একটি নার্সারি থেকে আরও ২০টি গাছ কিনে তা যশোরের কেশবপুর কলেজ, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রোপণ করেন সিদ্দিক মোড়ল। এভাবেই ৩৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং ক্লাবের জায়গায় একের পর এক বকুলগাছ লাগিয়েছেন তিনি।

খুলনা জেলা স্টেডিয়াম, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ জেলার বিভিন্ন সড়কে রয়েছে সিদ্দিক মোড়লের বকুলগাছ। খুলনা জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সহসভাপতি সরদার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘২০০৫ সালের দিকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন সিদ্দিক। তারপর কয়েক শ বকুলগাছের চারা নিয়ে আসেন। সেগুলো জেলা স্টেডিয়ামসহ বিভিন্ন ক্লাবের সামনে রোপণ করেন। আর কিছু চারা লাগান জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও বাসভবনে।’ তিনি বলেন, সিদ্দিক মোড়ল সরলমনের একজন নির্লোভ মানুষ। বকুলগাছ লাগানোর জন্য কেউ তাঁকে টাকা দিতে গেলে তা তিনি নেন না। অথচ কেবল বনজ সবজি বিক্রি করে সংসার চলে তাঁর।

১৯৯০ সালে বাবা মারা গেলে পরিবারের সম্পত্তি হিসেবে একটি গরু পান সিদ্দিক মোড়ল। এরপর বকুল চারার একটি নার্সারি করার পরিকল্পনা করেন তিনি। স্থানীয় এক ব্যক্তির কাছ থেকে বছরে দুই হাজার টাকায় ১০ কাঠা জমি ইজারা নেন। এর জন্য গরুটি ১ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করেন। বাকি ৫০০ টাকা পরিশোধ করেন শাকসবজি বিক্রি করে। ৭০ টাকা দিয়ে সাত কেজি বকুলের বীজ কিনে তা বোনেন ওই জমিতে। নিবিড় পরিচর্যায় চারাগুলো বড় করে তোলেন। কিন্তু বছর না পেরোতেই বাধে বিপত্তি। ইজারা নেওয়া জমির মালিকের ভাইদের মধ্যে জমির মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। একপর্যায়ে তাঁরা সিদ্দিক মোড়লকে দুই দিনের মধ্যে জমি ছেড়ে দেওয়ার জন্য বলেন। তখন জমিতে প্রায় সাত হাজার বকুলের চারা ছিল। দিশেহারা সিদ্দিক চারাগুলো তুলে নিয়ে চলে যান পাশের বিভিন্ন স্কুল, কলেজে। সেখানে নামমাত্র মূল্যে কিছু চারা বিক্রি করেন। বাকি চারা বিনা মূল্যে বিতরণ করেন শিক্ষার্থীদের মাঝে। কিছু চারা নিজ হাতে রোপণ করেন স্কুল, কলেজ ও সড়কের দুই পাশে।

এরপর আবার অন্য জমি ইজারা নিয়ে বকুলগাছের নার্সারি গড়ে তোলেন সিদ্দিক। ওই নার্সারির চারাই রোপণ করেছেন বিভিন্ন এলাকায়।

এসবের পরেও তার স্বপ্ন থেমে নেই। এবার সে বিভিন্ন অঞ্চলে তালের চারা লাগানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। চলতি বছর সে তাল গাছের মাথা তথা তাল কিনে গাছে পাকিয়ে তার থেকে যে বীজ পাবে তা দিয়ে চারা বানিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে সড়ক ও ওয়াপদার রাস্তায় লাগাবে। যা পথচারীরা বা সাধারণ মানুষ খাবে, ঝড় ও বজ্রপাত থেকে মানুষ প্রাণে বাঁচবে বলে আশা করেন।
উল্লেখ্য বকুল গাছ নিয়ে বিটিভি’র জনপ্রিয় ‘ইত্যাদি’ অনুষ্ঠানে তার একটি সাক্ষাৎকার প্রচার করে এবং ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার দেয়া হয়।

ভাল লাগলে শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

     এই বিষয়ের আরো সংবাদ