২২শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার,ভোর ৫:৫৫

নিরস্ত্র ভারতীয় সৈন্যদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে চীনা সৈনিকরা, দাবি পরিবারের

প্রকাশিত: জুলাই ৭, ২০২০

  • শেয়ার করুন

চীনের সঙ্গে লাদাখের গালোয়ান উপত্যকার বিরোধপূর্ণ সীমান্ত সংঘর্ষে যে ২০ জন ভারতীয় সেনা মারা যায়, তাদের সকলেই নিরস্ত্র ছিল। পাহাড়ের খাড়া ঢালের কিনারায় তারা এ অবস্থায় চীনা সেনাদের একটি বড় দলের ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে যায়। আচমকা হামলার মুখে হাতাহাতি লড়াইয়ে বাধ্য হওয়ার কারণেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রাণহানি ঘটেছে বলে দাবি করেছে নিহত সেনাদের পরিবার, ওই এলাকায় মোতায়েন দুই সেনা এবং ভারত সরকারের কিছু সূত্র।

নিহত এক সেনার বাবা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, আমার ছেলের গলা রাতের অন্ধকারে পেরেকের আঘাতে চিড়ে গিয়েছিল। সেখানে উপস্থিত আরেক সেনা সদস্য একথা আমাকে জানিয়েছে।

চীনা হামলার মুখে পিছু হটতে গিয়ে অনেক সেনা পড়ে যায় হিমশীতল গালোয়ান নদীর পানিতে। ঠাণ্ডা পানি আর উঁচু থেকে পড়ে যাওয়ার কারণে এসময় অনেকেরই তাৎক্ষণিক মৃত্যু ঘটে, বলে জানিয়েছে আরও কয়েকটি সেনা পরিবার। এসব বিবরণ তাদের জানিয়েছে গালোয়ানে মোতায়েন অন্য প্রত্যক্ষদর্শী সেনারা।

গত ১৫ জুনের সংঘর্ষে মৃত ২০ সেনার প্রত্যেকেই ছিল ১৬তম বিহার রেজিমেন্টের সদস্য। এসময় কোনো গুলি খরচ না হলেও, ১৯৬৭ সালের পর পরমাণু শক্তিধর দুই দেশ ভারত এবং চীনের মধ্যে সংঘর্ষে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় প্রাণহানির ঘটনা।

ওই সংঘর্ষে নিহত ১৩ জন ভারতীয় সেনা সদস্যের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে রয়টার্স। এদের মধ্যে পাঁচ জনের স্বজন তাদের ময়না তদন্ত রিপোর্ট বা মৃত্যু সনদ দেখিয়েছেন। যাতে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৪ হাজার ফুট উচ্চতায় ছয় ঘণ্টাব্যাপী ওই রাত্রিকালীন সংঘর্ষ চলাকালে ভয়াবহ আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে ভারতীয় সেনাদের মৃত্যুর বিবরণ রয়েছে।

এ ব্যাপারে লাদাখ অঞ্চলের ভারতীয় সামরিক হাসপাতালের সঙ্গেও যোগাযোগ করে রয়টার্স। সংঘর্ষের পর মৃতদেহগুলোকে প্রথমে এ হাসপাতালেই আনা হয়েছিল।

হাসপাতালটি অবশ্য সৈন্যদের মৃত্যুর কারণ জানাতে অস্বীকৃতি জানায়। তবে মৃতদেহগুলো পরীক্ষার পর মৃত্যু সনদসহ তা পরিবারের কাছে পাঠানোর বিষয়টি তারা নিশ্চিত করে।

আরও বিস্তারিত জানতে ওই এলাকায় মোতায়েন বিহার রেজিমেন্টের দুই সৈন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে রয়টার্স। এ দুইজন নিহতদের মৃতদেহগুলো তাদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার সময় সঙ্গে গিয়েছিল। তবে তারা চীনা সেনাদের সঙ্গে হাতাহাতি লড়াইয়ে অংশ নেয়নি।

সামরিক গোপনীয়তার কারণে ওই দুজন সেনা এবং সেনা পরিবারের সদস্যরা তাদের পরিচয় গোপন রাখার শর্তে সাক্ষাৎকার দেয়।

ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও, তাতে সাড়া পায়নি রয়টার্স।

অন্যদিকে রয়টার্সের অনুসন্ধানের জবাবে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র ইতোপূর্বে দেওয়া বিবৃতির পুনরাবৃত্তি করে- ভারতীয় পক্ষকেই নির্ধারিত সীমানা অতিক্রম করে অনুপ্রবেশের মাধ্যমে চীনা সেনাদের উস্কানি দেওয়ার অভিযোগ করেন।

চীনা মুখপাত্র বলেন, আমাদের সৈন্যরা যখন সেখানে আলোচনার জন্য যায়, তখন তাদের ওপর আকস্মিক এবং হিংস্রভাবে হামলে পড়ে ভারতীয়রা। এই ঘটনায় কে ন্যায় করেছে, কে অন্যায় করেছে- তা খুবই পরিষ্কার। এই ঘটনার জন্য আমাদের কোনো দায় নেই।’

চীন অবশ্য এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় আগ্রাসনের প্রমাণ দেয়নি। এব্যাপারে রয়টার্স চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া পায়নি।

এদিকে ভারতীয় সেনাদের মধ্যে তিনজনের ঘাড়ের শিরা ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল বলে তাদের মৃত্যু সনদে উল্লেখ করা হয়েছে। আরও দুইজনের মাথায় ধারালো ও সূচালো বস্তু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে বলে উল্লেখ ছিল।

পাঁচজনের মৃত্যু সনদেই নিহতদের ঘাড়ে এবং কপালে স্পষ্ট আঘাতের চিহ্নের কথা বলা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নয়া দিল্লির এক সরকারি কর্মকর্তা জানান, ‘সংঘর্ষে জড়িত প্রায় সকল সেনাই আহত বা নিহত হয়। হাতের কাছে রড, লাঠি যে যা পেয়েছে, এমনকি খালি হাত নিয়েই অনেকে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।’

ভারত সরকারের আরেকটি সূত্র দাবি করে, চীনের গণমুক্তি ফৌজ পূর্ব-পরিকল্পনা অনুসারে এ হামলা চালিয়েছে।

তবে পুরো ভারতকে কাঁপিয়ে দেওয়া এই সংঘর্ষের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করেনি সূত্রটি। এ ঘটনার পর থেকে ভারতজুড়ে চীনের বিরুদ্ধে সুপ্ত ঘৃণার আগুন, এখন যেন দাবানলে রূপ নিয়েছে।

এদিকে সংঘর্ষে চীনের পক্ষে ৪০ সেনা নিহতের যে দাবি ভারতের একজন মন্ত্রী করেছেন, তা সম্পূর্ণ অসত্য বলে নাকচ করে দিয়েছে বেইজিং। অবশ্য দিল্লিতে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত উভয়পক্ষেই হতাহত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

রাষ্ট্রদূত সুন ওয়েইডং বলেন, আলোচনার জন্য যাওয়া চীনা সেনাদের ওপর হঠাৎ করে হিংস্রতার সাথে হামলে পড়ে ভারতীয় বাহিনী। মূলত একারণেই ভয়াবহ হাতাহাতি লড়াইয়ের সূত্রপাত হয়। ফলে উভয়পক্ষেই হতাহতের ঘটনা ঘটে।

অন্যদিকে ভারত সরকারের বক্তব্য, বিহার রেজিমেন্টের কম্যান্ডিং অফিসার একটি ছোট টহলদার দল নিয়ে ১৪ নং পেট্রোলিং পয়েন্টের কাছে পৌঁছালে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। প্রতিশ্রুতি মোতাবিক চীনা সেনারা সেখান থেকে সরে গিয়েছে কিনা তা সরেজমিনে দেখতেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। এসময় তিনি চীনা সেনাদের রেখে তৈরি স্থাপনাগুলো ভেঙ্গে ফেলার নির্দেশ দেন।

এ ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে চীনা সৈন্যরা লোহার রড এবং পেরেক পোঁতা কাঠের মুগুর নিয়ে ভারতীয় সৈন্যদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। চীনা সেনাদের আকস্মিক হামলার মুখে সরু খাদের এক কিনারায় চলে আসে ভারতীয় সেনারা। এসময় তাদের অনেকেই নিচে দিয়ে প্রবাহিত খরস্রোতা গালোয়ান নদীতে পড়ে যায়।

বিশ্বের বৃহত্তম জনবহুল দুই দেশ ভারত এবং চীনের মাঝে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা বা সীমানা রয়েছে তিন হাজার ৪৮৮ কিলোমিটার। সাম্প্রতিক সংঘর্ষের ফলে উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক এবং কূটনৈতিক বিরোধ নতুন মাত্রা লাভ করেছে।

এর মধ্যেই নিরস্ত্র ভারতীয় সৈন্যরা চীনা সেনাদের বড় একটি দলের হামলায় মারা গেছে, এমন সংবাদ চীন বিরোধী মনোভাব আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। এছাড়া, ভারতীয় সেনাদের কেন উত্তেজনাপূর্ণ সীমান্ত এলাকায় অস্ত্রছাড়া টহলে পাঠানো হলো; তা নিয়েও প্রশ্নের জোয়ার উঠতে পারে এখন।

ইতোমধ্যেই ভারতীয় কংগ্রেস দলের নেতা রাহুল গান্ধি এক টুইট বার্তায় প্রশ্ন করেন, কেন আমাদের নিরস্ত্র সেনাদের নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হলো? এই ঘটনার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা তিনি সরকারের কাছে দাবি করেন।

ভাল লাগলে শেয়ার করুন
  • শেয়ার করুন