আজ শনিবার, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং, ৬ই আশ্বিন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

খালিশপুর ক্লিনিকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া ছাত্রের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ডাক্তার ও স্বজনদের পরস্পর বিরোধী বিবৃতি

খালিশপুর ক্লিনিকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুয়া ছাত্র রিপন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ডাক্তার ও মৃতের স্বজনদের পরস্পর বিরোধী বিবৃতি।

ডাঃ সুজাউদ্দিন ওরফে সোহাগকে রুগির স্বজনদের কর্তৃক মারপিটের ঘটনায় বাংলাদেশ প্রাইভেট প্র্যাকটিশনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএমপিএ) ও বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএইচসিডিওএ) এ বিক্ষোপ কর্মসূচির আয়োজন করে। অবিলম্বে এ ঘটনায় দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা না হলে বৃহত্তর আন্দোলন কর্মসূচি নেওয়া হবে বলে জানান, চিকিৎসক নেতারা ।

সোমবার (০৯ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টা থেকে শুরু হওয়া এই কর্মবিরতি চলে দুপুর ১টা পর্যন্ত। একই সঙ্গে দুপুর ১২টায় মহানগরীর সাত রাস্তার মোড়ে শহীদ মিলন চত্বরে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন চিকিৎসকরা। এসময় খুলনা মেডিক্যাল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালের আউটডোরে টিকিট দেওয়া ও চিকিৎসা সেবা বন্ধ ছিল। এছাড়া বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতেও চিকিৎসা সেবা বন্ধ থাকে। হঠাৎ করে চিকিৎসকদের কর্ম বিরতিতে ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ রোগী ও তাদের স্বজনরা।

এ ব্যাপারে খালিশপুর ক্লিনিক এ- ডায়াগণস্টিক এর স্বত্বাধিকারী বিশেষজ্ঞ সার্জন ও চিকিৎসক ডাঃ কাজী মুজাহিদুল ইসলাম এ প্রতিবেদককে বলেন, রিপর বুকে ব্যাথা জনিতকারণে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে। আমাদের এখানে রিপন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। বিষয়টি তার এক স্বজনকে জানানো হয়েছে। ঝামালা এড়াতে মৃত রিপনকে অন্যত্র হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছিলো। তিনি বলেন, রিপনকে নিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের ডাঃ সুজাউদ্দিন ওরফে সোহাগকে তারা জোর করে তুলে নিয়ে যায়। তারপর তাকে বেধরক মারপিট করে রুগীর স্বজনরা। বর্তমানে সে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে।

অপর দিকে নিহত মোঃ মুনির হোসেন ইসতিহাক ওরফে রিপনের পিতা মোহাম্মদ শওকত হোসেন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের মালিক ও চিকিৎসকদের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে যে বক্তব্য প্রদান করেন, তার তীব্র প্রতিবাদ করেন। তিনি বলেন, আমার ছেলের নামে সম্পূর্ন বানোয়াট কাহিনী প্রকাশ করে, চিকিৎসকগন প্রকৃত ঘটনা আড়াল করেছেন। আমার ছেলের মৃত্যুতে আমার পক্ষ থেকে কাহারো প্রতি অভিযোগ নেই। রিপনের যে পযন্ত আযু ছিল সেটুকু সময় পৃথিবীতে ছিল। তিনি চ্যালেঞ্জ করে বলেন, “আমার ছেলে মাদক ইয়াবায় কখনো আসক্ত ছিল না। তাকে গরুতে গুতাও দেয়নি কখনো । কেন যে তারা (চিকিৎসকগন) এভাবে অপবাদ দিচ্ছে । নিজেদের দূর্বলতা আড়াল করার জন্য ডাঃ বঙ্গ কমল বসু যে বক্তব্য দিয়েছেন, আমি তার তীব্র প্রতিবাদ করছি।” কারণ ক্লিনিক হতে প্রদত্ত ডাক্তারী ব্যবস্থাপত্রে মদ্যপান ও ইয়াবা সংক্রান্ত কোন বিষয়ে উল্লেখ করা হয় নাই। যদি সেধরনের কারণে আমার ছেলে ক্লিনিকে ভর্তি হতো, তাহলে তো সেভাবেই চিকিৎসা প্রদান করতেন কিন্ত তা করেন নাই। এতে স্পষ্টভাবে প্রমান হয় যে, প্রতিবাদ সমাবেশের বক্তব্যের সাথে তাদের চিকিৎসার যে অমিল এবং সম্পূন্নভাবে বানোয়াট উদ্দেশ্যে প্রণোদিত। একজন মৃত ব্যক্তির নামে এভাবে মিথ্যা গুজব ছড়ানোটা কতটা যুক্তি সংগত । এসময় চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র ও ডেথ সার্টিফিকেটের ছায়ালিপি প্রতিবেদকের নিকট হস্তান্তর করেন ।

এ প্রসংগে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক গতকাল সোমবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে মুজগুন্নী শেখ পাড়ায় বিভিন্ন মহলে অনুসন্ধান করে জানতে পারে, রিপন অত্যন্ত বিনয়ী প্রকৃতির ছেলে ছিল । রিপনদের বাড়ী ৬৬/১ মুজগুন্নী শেখ পাড়া রিপনদের আমাদের প্রতিবেদক বাসায় গেলে রিপনের পিতা অবসরপ্রাপ্ত নৌ বাহিনীর কর্মকর্তা শওকত হোসেন বলেন, রাত এগারো টায় খাওয়া-দাওয়ার পর হঠাৎ বুকে ব্যাথা অনুভূত হওয়ার কারণে তাকে তাৎক্ষণিক খালিশপুর ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক রিপনকে মাত্র ২৪ মিনিটের মধ্যে এক হাজার সিসি স্যালাইন পুশ করেন। এরপর রিপন কিছুটা সুস্থতা বোধ করে। কিছুক্ষুন পর রিপনের সারা শরীর ঘেমে সে আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে। কর্তব্যরত সেবিকা চিকিৎসকে ডেকে আনলে তিনি একটা ইনজেকশন পুশ করেন। তখন ডাঃ সুজাউদ্দিন সোহাগ তাকে (রিপনকে) সিটি মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন। আমার ছেলেকে তারা যখন হাসপাতাল থেকে যখন বের করে দিয়ে, তারপর অন্য এক ব্যক্তির মাধ্যমে ভোর চারটায় আমার ছেলে মারা গেছে উল্লেখ করে, একটি ডেথ সার্টিফিকেট প্রদান করে। এরপরই জানলাম আমার ছেলে আর বেচে নেই”। অতপরঃ খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হতে ভোর ৪.৫৫ টার “ব্রথ ডেথ” সার্টিফিকেট প্রদান করে। এসময় তিনি রিপনের সৃত্মি জড়িত যেমনঃ ব্যবহুত মোবাইল, খেলারধূলার সামগ্রী ও মাছ ধরার বড়শি ধরে বারবার অপ্লূত হয়ে পড়েন । তিনি জানান, প্রতি শুক্রবার মাছ ধরা ছিল তার একমাত্র নেশা । উল্লেখ্য যে, রিপনের বড় ভাই বর্তমানে সুইডেনে বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পি,এইচ,ডি করছেন ।

রিপনের খালা সুলতানা বলেন, ক্লিনিকে যখন রিপন পুনরায় অসুস্থ হয়ে পড়ে তখনই ডাক্তার বলেন আপনারা তাকে (রিপন) দ্রুত সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। তখন আমি বলি, “আমরা তো নিয়ে যাবো তাহলে এখানে যে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে তার একটা ব্যবস্থাপত্র দেন কিন্ত তার আগেই মৃত লাশ (রিপনকে) রেফার্ড করেন এবং ডেথ সার্টিফিকেট ধরিয়ে দেন।

এসময় উপস্থিত সিটি কর্রপোরেশনের ৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাহফুজুর রহমান লিটন আমাদের প্রতিবেদককে বলেন, রিপন এলাকায় খুব ছেলে ছিল। সে ক্রিকেট ভালো ক্রিকেট খেলোয়ার ছিলা। সে এক সময় জাতীয় ক্রিকেট দলের অনুর্ধ্ব ঊনিশের তালিকাভূক্ত খেলোয়ার ছিল। তিনি অনেকটা ক্ষোপ প্রকাশ করে বলেন, আমার কাছে খালিশপুর ক্লিনিকের বিরুদ্ধে এর আগেও অনেক অভিযোগ এসেছে। তারা চিকিৎসার জন্য উডপযুক্ত ডাক্তার না থাকলেও এ ক্লিনিকে রোগীকে ভর্তি করে। যে রোগীর জন্য ডাক্তার প্রয়োজন সেই ডাক্তার যদি না থাকে তাহলে তারা অন্যত্র রেফার্ড করবে এটাইতো নিয়ম। সব বিষয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কি ওই ক্লিনিকে আছে ? এমন প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি বলেন, রিপনের ডেথ সার্টিফিকেটে অনেক বানান ভুলে ভরা। যেখানে ডেট সার্টিফিকেট ঠিকমত লিখতে পারে না, সেখানে চিকিৎসকদের অবস্থা কেমন সেটাতো বুঝাই যাচ্ছে।

একই মহল্লার বাসিন্দা মল্লিক মনিরুল হক বলেন, রিপনকে আমি জন্ম হওয়ার পর থেকেই দেখে আসছি। তার কোন বাজে ধরনের বন্ধু-বান্ধব নেই। সে খুব ভালো ক্রিকেটার ছিল এবং খুলনা বড় মাঠের পাশে কাশেম স্মৃতি স্পোর্টিং ক্লাবে নিয়মত খেলতো। ওর মতো ভদ্র ছেলে এলাকায় একটা খুজে পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ। তার এই অকাল মৃত্যু কোন ভাবেই এলাকাবাসী মেনে নিতে পারছে না।

উল্লেখ্য যে, গত শনিবার (০৭ সেপ্টেম্বর) রাতে রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র নগরীর খালিশপুর ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সিটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র রিপনের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কর্তব্যরত চিকিৎসককে ধরে নিয়ে খুমেক হাসপাতালের সামনে মারধর করে রোগীর সহপাঠী ও স্বজনরা। ডাক্তার সুজাউদ্দিন সোহাগের উপর হামলার অভিযোগে দুইজন আটক হয়েছে। আটকরা ঘটনার সঙ্গে জড়িত আরও পাঁচ জনের নাম বলেছে।

https://web.facebook.com/100020036448511/videos/381777885833423/

ভাল লাগলে শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

     এই বিষয়ের আরো সংবাদ