আজ মঙ্গলবার, ১৬ই জুলাই, ২০১৯ ইং, ১লা শ্রাবণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

ঈদুল ফিতরের অর্থ ও নামাজের নিয়ত, নিয়ম ও ফজিলত জেনে নিন !!

ঈদুল ফিতর আরবি দুইটি শব্দযোগে গঠিত হয়েছে। প্রথমটি ঈদ; যার অর্থ হচ্ছে আনন্দ বা খুশির দিন- যা প্রতি বছর ফিরে আসে। আর ফিতর শব্দটির অর্থ হচ্ছে রোজা ভাঙা। ইফতার শব্দটি এ ফিতর শব্দ থেকেই এসেছে। সে হিসেবে ঈদুল ফিতরের অর্থ দাঁড়ায় রোজা না রাখার দিন। মুসলমানদের জীবনে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার সূত্রপাত ঘটে আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর মদিনায় হিজরতের পর।

ঈদুল ফিতরের গুরুত্ব ও ফজিলত সম্পর্কে হজরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে প্রিয় নবী হজরত রাসুলে আকরাম (সা.) বলেছেন, ‘ঈদুল ফিতরের দিন ফেরেশতারা জমিনে নেমে আসেন এবং উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে এমনভাবে আওয়াজ দিতে থাকেন যে, মানুষ ও জিন ছাড়া আল্লাহর সব সৃষ্টি তা শুনতে পায়। ফেরেশতারা বলেন, হে উম্মতে মুহাম্মদ! তোমরা তোমাদের দয়াময় রবের উদ্দেশে বের হও, তিনি আজ অতি বিরাট দান করবেন এবং বড় গোনাহ মাফ করবেন। মুসলমানরা ঈদগাহে হাজির হলে আল্লাহ ফেরেশতাদের লক্ষ্য করে বলেন, হে ফেরেশতারা! কাজ থেকে শ্রমিকের পারিশ্রমিকের ব্যাপারে তোমাদের রায় কী? জবাবে ফেরেশতারা বলেন, হে আমাদের মাবুদ! শ্রমিকদের তার পারিশ্রমিক দিয়ে দিন। তখন আল্লাহ বলেন, আমি তোমাদের সাক্ষী করে বলছি, আমি তাদের নামাজ ও রোজার সওয়াবকে আমার সন্তুষ্টি ও ক্ষমায় পরিণত করলাম। হে মোমিনরা! তোমরা নিষ্পাপ অবস্থায় ফিরে যাও।’

আসমানে ঈদকে পুরস্কার দিবস বলা হয়। আসমান ও জমিনের মাঝখানে ওই পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত হয়। বড় পুরস্কারের জন্য বড় গণজমায়েত দরকার। তাই ঈদ হচ্ছে বৃহত্তম গণজমায়েতের ব্যবস্থা। এ সমাবেশ হাশরের ময়দানের বিশাল সমাবেশকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সেখানেও সব মানুষকে তাদের কাজের পুরস্কার দেয়া হবে। তবে সেই পুরস্কার খারাপও হতে পারে কিংবা ভালোও হতে পারে। নেক বেশি হলে পুরস্কার আনন্দদায়ক হবে, আর পাপ বেশি হলে পুরস্কার হবে বেদনাদায়ক। ঈদের পুরস্কারও একইরূপ হবে।

ঈদের দিন যখন সাহাবায়ে কেরামরা পরস্পর আলিঙ্গন করতেন তখন বলতেন, ‘তাকাব্বালল্লাহু মিন্না ও মিনকুম’ অর্থাৎ, আল্লাহ পাক তোমার ও আমার ইবাদত কবুল করুন।

ঈদের দিনে কিছু সুন্নত

দ্রুত ঘুম থেকে ওঠা, ফজরের নামাজ আদায় করে গোসল করা, যথাসম্ভব উত্তম ও সুন্দর পোশাক পরিধান করা, খুশবু ও আতর লাগানো, ঈদুল ফিতরের নামাজের আগে কিছু মিষ্টি বা নাশতা খাওয়া, সত্বর ঈদগাহ বা মসজিদে গমন করা, ঈদের নামাজের আগে ফিতরা প্রদান করা, এক পথে ঈদগাহে গমন করা ও অন্যপথে আসা। ঈদগাহে আসা-যাওয়ার সময় উচ্চৈঃস্বরে এ তাকবির পড়া- ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।’

ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার নামাযের নিয়ম
বছরে মাত্র দু’বার ঈদের নামাজ, তাই এ নামাজ আদায় করার ক্ষেত্রে অনেককেই জটিলতায় পড়তে হয়। নামাজে দাঁড়িয়ে ডানে-বামে চুপিসারে তাকিয়ে নামাজ শেষ করতে হয়। ফলে অনেকেরই ঈদের নামাজ হয় না। কিন্তু এই নিয়মগুলো যদি একটু মনে রাখেন, তবে শুদ্ধভাবে ঈদের নামাজ পড়তে আর সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

কোনো নামাজের নিয়তই আরবিতে করা জরুরি নয়। যে কোনো ভাষায় নামাজের নিয়ত করা যায়। নিয়ত মনে মনে করাই যথেষ্ট।
ঈদের দিন ইমামের পেছনে দাঁড়িয়ে মনে মনে নিয়ত এভাবে করলেই চলবে_ ‘আমি অতিরিক্ত ছয় তাকবিরসহ এই ইমামের পেছনে ঈদুল ফিতরের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ আদায় করছি।’
এরপর উভয় হাত কান বরাবর উঠিয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে হাত বাঁধতে হবে।
হাত বাঁধার পর ছানা অর্থাৎ ‘সুবহানাকা আল্লাহুম্মা…’ শেষ পর্যন্ত পড়তে হবে।
এরপর আল্লাহু আকবার বলে হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে ছেড়ে দিতে হবে।
দ্বিতীয়বারও একই নিয়মে তাকবির বলে হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে ছেড়ে দিতে হবে।
তৃতীয়বার তাকবির বলে হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে ছেড়ে না দিয়ে হাত বেঁধে রাখতে হবে।
ঈমাম সাহেব সূরা ফাতিহার সঙ্গে অন্য যে কোনো সূরা তেলাওয়াত করবেন। এ সময় মুক্তাদিদের নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।
ইমাম সাহেব নিয়মমতো রুকু-সিজদা সেরে দ্বিতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়াবেন। মুক্তাদিদেরও ইমামকে অনুসরণ করতে হবে।
দ্বিতীয় রাকাতে ইমাম সাহেব প্রথমে সূরা ফাতিহার সঙ্গে অন্য সূরা পড়বেন।
এরপর আগের মতো তিন তাকবির বলতে হবে। প্রতি তাকবিরের সময়ই উভয় হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে ছেড়ে দিতে হবে।
চতুর্থ তাকবির বলে হাত না উঠিয়েই রুকুতে চলে যেতে হবে। এরপর নামাজের অন্যান্য নিয়মেই ঈদের নামাজ শেষ করে সালাম ফেরাতে হবে।

ঈদুল ফিতরের কিছু সুন্নত আমল
* খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা
* মিসওয়াক করা
* গোসল করা
* সামর্থ্য অনুযায়ী উত্তম পোশাক পরিধান করা
* সুগন্ধি ব্যবহার করা
* নামাজের আগে ফিতরা আদায় করা
* নামাজের আগেই মিষ্টান্নজাতীয় খাবার খাওয়া
* বেজোড়সংখ্যক খেজুর-খুরমা খাওয়া
* ঈদগাহে হেঁটে যাওয়া
* এক রাস্তা দিয়ে যাওয়া এবং অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরে আসা
* সকাল সকাল ঈদের নামাজ পড়ার জন্য বের হওয়া
* ঈদের নামাজ ঈদগাহে গিয়ে পড়া; সম্ভব না হলে পাড়া বা মহল্লার মসজিদে গিয়ে পড়া
* ঈদুল ফিতরে নিচু আওয়াজে তাকবির পড়তে পড়তে ঈদগাহে যাওয়া [ তাকবির হলো_ ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।’।

ঈদুল আযহার নামাযের নিয়ম ঠিক ঈদুল ফিতরের নামাযেরই অনুরূপ এবং যেসব কাজ ওখানে সুন্নত সেসব এখানেও সুন্নত। পার্থক্য শুধু এই যে,
* নিয়তের মধ্যে ঈদুল ফিতরের পরিবর্তে ঈদুল আযহা বলবে।
* ঈদুল ফিতরের দিন কিছু খেয়ে ঈদগাহে যাওয়া সুন্নত কিন্তু ঈদুল আযহার দিনে খেয়ে যাওয়া সুন্নত নয় (বরং ঈদুল আযহার নামাযের পূর্বে কিছু না খেয়ে যাওয়াই মুস্তাহাব)।
* ঈদুল আযহার দিনে ঈদগাহে যাওয়ার সময় উচ্চস্বরে তাকবীর পড়া সুন্নত। ঈদুল ফিতরে আস্তে পড়া সুন্নত।
* ঈদুল আযহার নামায ঈদুল ফিতর অপেক্ষা অধিক সকালে পড়া সুন্নত।
* ঈদুল ফিতরে নামাযের পূর্বে সদকায়ে ফিতরা দেয়ার হুকুম, ঈদুল আযহার নামাযের পর সক্ষম ব্যক্তির জন্য কুরবানী করার হুকুম।

ভাল লাগলে শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

     এই বিষয়ের আরো সংবাদ