আজ মঙ্গলবার, ২২শে অক্টোবর, ২০১৯ ইং, ৭ই কার্তিক, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ

আজ পবিত্র জুমা; জুমা দিবসের তাৎপর্য

জুমার দিন এক অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যম-িত দিন। জুমা শব্দের অর্থ সমাবেশ। ইয়াওমুল জুমা অর্থ সমাবেশ দিবস। এই দিবসটি সৃষ্টির আদিকাল থেকে বিশেষ মর্যাদার দিন হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

আল্লাহ জাল্লা শানুহু দিবসটিকে মানুষের জন্য সমাবেশ দিবস হিসাবে, সাপ্তাহিক আনন্দ উৎসবের দিন হিসেবে নির্ধারণ করে দেন। আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু বিশ্বজগত সৃষ্টি করেন ছয় দিনে। তিনি পৃথিবীর সময়ের হিসাবে রবিবারে সৃষ্টি করা শুরু করে শুক্রবারে সমাপ্ত করেন। কুরআন মজিদে এই ছয় দিনে আসমানসমূহ ও যমিন সৃষ্টির উল্লেখ করে ইরশাদ হয়েছে : তোমাদের রব আল্লাহ যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেন ছয় দিনে, অতঃপর তিনি সমাসীন হন আরশে। তিনিই দিবসকে রাত্রি দ্বারা আচ্ছাদিত করেছেন, যাতে ওগুলো একে অন্যকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে, আর সূর্য, চন্দ্র নক্ষত্ররাজি যা কিছু রয়েছে সবই তাঁর হুকুমের অধীন, তা তিনিই সৃষ্টি করেছেন। জেনে রাখো, সৃজন আর হুকুম তাঁরই। মহিমাময় আল্লাহ হচ্ছেন বিশ্বজগতের রব্-রব্বুল আলামীন। (সূরা আ’রাফ : আয়াত ৫৪)।

সমস্ত নবীর আমলেই জুমা দিবসের কদর ছিল। কিন্তু ইয়াহুদীরা এ দিবসের বদলে শনিবার বা ইয়াওমুস্ সাব্তকে গ্রহণ করে এবং খ্রীস্টানরা গ্রহণ করে সানডে বা রবিবারকে। ইয়াওমুস সাব্ত অর্থ বিশ্রাম দিবস। এ দিবসেরও উল্লেখ কুরআন মজীদে আছে। ইয়াহুদীদের অভিশপ্ত জাতি হিসেবে উল্লেখ করে ইরশাদ হয়েছে : তাদের অঙ্গীকারের জন্য আমি (আল্লাহ) তুর পাহাড়কে তাদের উর্ধে উত্তোলন করেছিলাম এবং তাদের বলেছিলাম, নতশিরে দ্বারে প্রবেশ কর। তাদের আরও বলেছিলাম, সাবত-এ বিশ্রাম দিবস অর্থাৎ (শনিবারে) সীমা লঙ্ঘন কর না এবং তাদের কাছ থেকে দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়েছিলাম। অতঃপর তারা লা’নতগ্রস্ত (অভিশপ্ত) হয়েছিল অঙ্গীকার ভঙ্গ করার কারণে, আল্লাহর আয়াতকে প্রত্যাখ্যান করার কারণে, নবীগণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার কারণে এবং তারা উক্তি করেছিল যে- আমাদের হৃদয় আচ্ছাদিত হয়েছে- সেই কারণে। (সূরা নিসা : আয়াত ১৫৪-১৫৫)।

সরওয়ারে কায়েনাত প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম মক্কা মুকাররমা থেকে মদিনা মনওয়ারায় হিজরত করাকালে তিনি তদানীন্তন ইয়াছরিব নগরীতে প্রবেশের পূর্বে বেশ কয়েকদিন মদিনা মনওয়ারার সীমান্ত কুবা পল্লীতে অবস্থান করেন এবং এখানে একটি মসজিদ স্থাপন করে যার ভিত্তিপ্রস্তর তিনি তাঁর মুবারক হাত দিয়ে স্থাপন করেন। এটিই তাঁর পবিত্র হাতে প্রতিষ্ঠিত প্রথম মসজিদ। এই মসজিদের উল্লেখ কুরআন মজিদে রয়েছে এবং তাকে তাকওয়া মসজিদ বলা হয়েছে। এই কুবা মসজিদে দু’রাকাত নফল সালাত আদায় করলে একটি উমরাহ্ আদায় করার সমান সওয়াব পাওয়া যায়। যে দিন তিনি কুবা থেকে মদিনা মুখে রওনা হলেন সেদিন ছিল ইয়াওমুল জুমা- শুক্রবার। তিনি তাঁর সাদা রঙের কাসওয়া নামের উষ্ট্রীয় পিঠে চড়ে চলছিলেন। ইতোমধ্যে তাঁর নিকট ওহী নাজিল হয়েছে : – ওহে তোমরা যারা ইমান এনেছ! জুমার দিনে যখন সালাতের জন্য আহ্বান করা হয় তখন তোমরা আল্লাহর যিকরের দিকে ধাবিত হও এবং কেনা-বেচা বন্ধ রাখো, এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর যদি তোমরা উপলব্ধি কর। (সূরা জুমা : আয়াত ৯)।

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম কুবা থেকে মাত্র দেড় মাইল অগ্রসর হয়ে বনী সালিম মহল্লায় এলে সূর্য তখন মাথার ওপর থেকে পশ্চিমে একটু ঢলে পড়েছে। তিনি এখানে অবতরণ করে জুমার সালাত আদায় করলেন। এটাই ইসলামের ইতিহাসে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ইমামতিতে প্রথম জুমার সালাত।

তিনি সেদিন জুমার যে খুতবা প্রদান করেন তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খুতবা। সেই দীর্ঘ খুতবার এক পর্যায়ে তিনি বলেন, সেই ব্যক্তি সত্যিকার হিদায়াতের আলোয় আলোকিত পথের খোঁজ পেয়েছে যে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পূর্ণ আনুগত্য করে যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে না সে পথভ্রষ্ট, সে স্বহস্তে তার সৌভাগ্যের দ্বার রুদ্ধ করেছে এবং ভয়াবহ পথভ্রষ্টতায় নিজেকে নিমজ্জিত করেছে। তাকওয়া অবলম্বন কর। তাকওয়া হচ্ছে এমন এক অমূল্য সম্পদ যা বান্দাকে আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও শাস্তি থেকে নিরাপদ রাখে। হাশরের ময়দানে তাকওয়াই বান্দার চেহারা উজ্জ্বল করে তুলবে। আল্লাহ্্র সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যম হচ্ছে তাকওয়া, উচ্চতর মর্যাদা লাভের উপায়ও হচ্ছে তাকওয়া। সর্বদা আল্লাহ্্র যিক্্র করবে।… প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম জুমার সালাত শেষে আবার এগোতে থাকেন। ইয়াসরিবের নামকরণ হয়ে যায় মদিনাতুন্্ নবী- নবীর শহর যা এখন মদিনা মনওয়ারা নামে জগতজোড়া পরিচিতি লাভ করেছে। মদিনা মনওয়ারায় তিনি যে মসজিদ স্থাপন করেন সেটাই মসজিদুন্নববী। প্রিয় নবী (সা.) বনী সালিমে যেখানটায় প্রথম জুমার সালাত কায়েম করেছিলেন সেখানে সেই স্মৃতি বহন করছে মসজিদে জুমা নাম ধারণ করে। মসজিদে নববীর পরে বাইরের অঞ্চলে প্রথম যে মসজিদে জুমার সালাত আদায় করা হয় সেটি হচ্ছে বাহরায়নের জুওয়াই শহরে অবস্থিত আব্দিল কায়স মসজিদ।

উল্লেখ্য, পাঞ্জেগানা সালাতসহ যে মসজিদে জুমার সালাত আদায় করা হয় সেই মসজিদকে জামি মসজিদ বলা হয়। এই মসজিদকে কেন্দ্র করে মসজিদ স্থাপত্য শিল্প বিশেষ সৌকর্যম-িত হয়েছে।

পৃথিবীর এমন কোন দেশ নেই যেখানে মসজিদ নেই। বিশ্বজুড়ে এখন লাখ লাখ মসজিদে একই নিয়মে দ্বিপ্রহরের নির্দিষ্ট ওয়াক্তে জুমার সালাত আদায় হয়ে আসছে। বাংলাদেশেই রয়েছে প্রায় দুই লাখ জামি মসজিদ। জুমার দিনের ঐতিহাসিক তাৎপর্য রয়েছে। আদিকাল থেকে চলে আসা ইয়াওমুল জুমা নামটি একপর্যায়ে ইয়াওমে আরূবা করা হয়, হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লামের আবির্ভাবের প্রায় পাঁচ শ’ ষাট বছর পূর্বে তাঁর এক পূর্ব পুরুষ কা’ব ইবনে লুঈ আবার এই দিনটির নাম ইয়াওমুল জুমায় পরিবর্তন করেন। কাব ইবনে লুঈ মিল্লাতে ইব্্রাহীম ধারণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন এবং তিনি এদিনে সামাজিক সমাবেশের ব্যবস্থা করেছিলেন। মদিনা মনওয়ারাতেও এই ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল।

এই দিবসকে আল্লাহ্্ জাল্লা শানুহু দিবসের মধ্য প্রহরে আদায়ের জন্য যে সালাত বিধান নির্ধারণ করে দিলেন তাকেই সালাতুল জুমা বা জুমার সালাত বলা হয়। এখানে উল্লেখ্য, সালাতকে আমরা যে নামাজ বলি এ নামাজ ফারসী শব্দ। ফারসীতে সালাতের অর্থ করা হয়েছে নামাজ। অনেকেই জুমাকে জুমা, জুম্মা ইত্যাদি বানানে লিখে থাকেন। অথচ এর প্রকৃত উচ্চারণ জুমা। কুরআন মজিদের ৬২ নম্বর সূরার নাম সূরাতুল জুমা।

জুমার সালাত জুমার দিনের যোহরের সালাতের পরিবর্তে আদায় করতে হয়। পাঁচ ওয়াক্ত সালাম একাকী গৃহে আদায় করা যায়, কিন্তু জুমার সালাত মসজিদে জামাত ছাড়া আদায় করা যায় না। জুমার সালাতের ফরজ দুই রাকাত সালাতের পূর্বে ইমাম সাহেব খুতবা দেন। এই খুতবা মনোযোগ সহকারে শুনতে হয়। স্ত্রীলোক, রোগী এবং মুসাফিরের জন্য জুমার সালাত শিথিল করা হলেও ওই সময় যোহরের সালাত গৃহে বা অবস্থানস্থলে আদায় করতে হবে।

জুমা দিবসের মাহাত্ম্য অনেক। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, সূর্য উদয় হওয়ার দিনগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম দিন হচ্ছে জুমার দিন, এই দিনেই হযরত আদম ‘আলায়হিস সালামকে সৃষ্টি করা হয়, এই দিনেই তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়, আবার এই দিনেই তাঁকে বের করানো হয় এবং কিয়ামত সংঘটিত হবে এই দিনেই। (মুসলিম শরীফ)।

জুমার সালাত সম্পর্কে মিশকাত শরীফে সঙ্কলিত একখানি হাদিসে আছে যে, কেউ যদি বিনা ওজরে সালাতুল জুমা তরফ করে তাহলে তার নাম এমন কিতাবে মুনাফিক হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয় যার লেখা মুছে ফেলা যায় না এবং তা পরিবর্তিত হয় না। জুমার দিন ঐক্য সংহতির চেতনা জাগ্রত করার জন্য ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সাপ্তাহিক সমাবেশের দিন। এ এক মুবারক দিন।

লেখক : পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর দরবার শরীফ

ভাল লাগলে শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

     এই বিষয়ের আরো সংবাদ